॥ শামীম ইকবাল চৌধুরী, ঘুমধুম সীমান্ত থেকে ফিরে ॥
পার্বত্য বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তের ঘুমধুমে কুমির চাষে বিস্ময়কর সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছেছে। প্রতিষ্টিত এশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম কুমির চাষ প্রকল্পে শুরু করা ৫০টি আমদানিকৃত কুমির বাচ্চা থেকে ৫শত ৬০টি কুমিরের সফলতা দেখে উদ্যোক্তারা মহা খুশি।
প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষ রপ্তানিকারকদের বরাত দিয়ে জানান, সীমান্তের ঘুমধুমের পাহাড়ে প্রতিষ্ঠিত কুমির চাষ প্রকল্পটি কেবল বাংলাদেশে নয় এটি দক্ষিণ এশিয়ার সর্ব বৃহৎ কুমির চাষ প্রকল্প। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কুমির চাষ বিরাট ভুমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে জানিয়েছেন রপ্তানি কারকরা।
আর এদিকে, এ বেসরকারি ভাবে গড়ে ওঠা কুমির চাষ প্রকল্পটি সঠিকভাবে পরিচর্যা করা হলে আরও বেশি কুমির রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কক্সবাজারের উখিয়া উপজেলা সদর থেকে ৪ কিলোমিটার ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা থেকে প্রায় ৬০ কিলোমিটার দুরত্বে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের বালুখালী টেলিভিশন উপ-কেন্দ্রের গেইটের ঠিক সোজা বিপরীতে পূর্ব পাশে মাত্র আধা কিলোমিটার ভেতরে ঘুমধুম মৌজার পাহাড়ি ২৫ একর জমিতে আকিজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ ২০০৮ সালে গড়ে তোলে ‘আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেড’ নামের কুমিরের খামারটি।
তবে বাণিজ্যিকভাবে তারা কুমিরের চাষ শুরু করে ২০১০ সালে। প্রথম দফায় অস্ট্রেলিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে ৫০টি অস্ট্রেলীয় প্রজাতির কুমির আমদানি করে খামারের উন্মুক্ত জলাশয়ে ছাড়া হয়। প্রতিটি কুমির কিনে আনা হয়েছিল তিন লাখ ৫০ হাজার টাকায়। এর মধ্যে ৪টি কুমির মারা গেলেও সুস্থ রয়েছিলো ৪৬টি। তার মধ্যে ৩১টি মাদি কুমির, আর ১৫টি (পুরুষ) মাদাম। একেকটি কুমির প্রাপ্তবয়স্ক হতে সময় লাগে ৮ থেকে ১০ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক একেকটি মাদি কুমির ৪০ থেকে ৮০টি পর্যন্ত ডিম দেয়। সাধারণত বর্ষাকালে এরা ডিম দেয়। ডিম ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় ৮০ থেকে ৯০ দিন ইনকিউবেটরে রেখে বাচ্চা ফোটানো হয়। বর্তমানে খামারে ছোট-বড় কুমিরের সংখ্যা ৫ শত ৬০টি। এখানে উন্মুক্ত জলাশয় ও খাঁচার ভেতরে-দুইভাবেই কুমির রাখা হয়েছে।
আকিজ ওয়াইল্ড লাইফ ফার্ম লিমিটেডের কুমির প্রকল্পের অ্যাডভাইজার ঝুলন কান্তি দে বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য পর্যটক ও স্থানিয় দর্শনার্থীদের সমাগম হচ্ছে কুমির চাষ দেখতে।
মালেশিয়া থেকে ৫০টি কুমিরের বাচ্চা আমদানি করে ঘুমধুম পাহাড়ে আধুনিক ও প্রযুক্তির মাধ্যমে কুমির চাষ করা হয়। বেশ কয়েক বছর পূর্বে গড়ে উঠা এ প্রকল্পের আমদানী করা ৫০টি বাচ্চা কুমির বড় করে এবং প্রজননের মাধ্যমে ৫ শত ৬০টিতে দাঁড়িয়েছে মাদাম-মাদি। এরই মধ্যে লালিত পালিত প্রায় মাদি কুমির বাচ্চা দেওয়া শুরু করেছে বেশ কয়েক বছর আগে থেকে।
এসব কুমির রপ্তানির জন্য তৈরি প্রতিটি কুমির ৫ ফুট লম্বা, ওজন ২০ থেকে ২৫ কেজি হতে হয়। চামড়া ছাড়াও কুমিরের প্রতি কেজি মাংস প্রায় ৩০ থেকে ৪০ ডলারে বিক্রি হয় বিদেশে। তবে কুমিরের মাংস রপ্তানি করার বন্ধ। বন বিভাগ অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হয়। এখন বন বিভাগ থেকে কোন রখম অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। কুমিরগুলো লবণাক্ত এবং মিঠা পানিতে বসবাসযোগ্য বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, কুমির চাষের পাশাপাশি সেখানে বিভিন্ন পশু-পাখি, প্রজাপতি চাষ, বার্ড পার্কসহ কয়েকটি কটেজ ও মিউজিয়াম হাউস নির্মাণ করে প্রকল্পটিকে আকর্ষণীয় পর্যটন স্থান হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হলেও সরকারের সহযোগিতা ছাড়া কোন মতেও সম্ভব নয় মিউজিয়াম হাউজটি চালু করা।
প্রকল্পের অন্যান্য সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, নিবিড় পরিচর্যা, চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত খাবার প্রয়োগ করায় বর্তমানে সকল বাচ্চা সুস্থ অবস্থায় দিন দিন বাচ্চাগুলো বড় হচ্ছে। মালেশিয়া, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চিন, জাপানসহ বিভিন্ন পশ্চিমা দেশে কুমিরের মাংসের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। তবে কুমিরের মাংস সরাসরি প্যাকেট জাত করে রপ্তানি করার অনুমোদন নেই বন বিভাগের। সরকার রাজস্ব আদায়ের মাধ্যমে এ প্রকল্পে উৎপাদিত কুমির এসব দেশে রপ্তানি করে হাজার কোটি টাকা করার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের ব্যাপক অবদান রাখবে।
স্থানীয় বাসিন্দা সংবাদ কর্মী নুর মোহাম্মদ জানান, ঘুমধুমে কুমির খামারটি গড়ে ওঠায় স্থানীয়দের কর্মসংস্থানের পথ সৃষ্টি হয়েছে। বর্তমানে খামারে প্রায় ২০/২২ জন কর্মচারী ও দুজন প্রকল্প কর্মকর্তা রয়েছেন। প্রতিদিনই খামারটি দেখতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে পর্যটকরা ভিড় জমাচ্ছেন।
কক্সবাজার থেকে কুমির দেখতে আসা দর্শনার্থী জেসমিন আকতার জেমি বলেন, আগে কখনো কুমির দেখিনি, সচোক্ষে কুমির অনেক ভালো লেগেছে। একই কথা তার সহপাঠী শামীমা আক্তার বৃষ্টি।
