পাহাড়ী বিলে শামুকখোলের ডানার মেলা: সুবলং এখন পাখির স্বর্গরাজ্য

82

॥ সুমন্ত চাকমা, জুরাছড়ি ॥
পাহাড়ের গা ঘেঁষে এঁকেবেঁকে চলা কাপ্তাই হ্রদের শান্ত নীল জলরাশি। আর তার বুকেই জেগে ওঠা রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলার সুবলং বিল। এই বিল এখন শুধুই পানি আর কাদার আধার নয়, যেন এক জীবন্ত ক্যানভাস! যেখানে ডানা মেলেছে হাজারো সাদা-কালো অতিথি পাখি— শামুকখোল।
সম্প্রতি সুবলং বিল এলাকায় চোখ পড়লেই দেখা যাচ্ছে এক অদ্ভুত সুন্দর দৃশ্য। ছবিতে যেমনটি দেখা যাচ্ছে, বিলের অগভীর পানিতে কাদা ঘেঁটে খাবার খুঁজছে অগুনতি পাখি। আবার হঠাৎ করেই কোনো এক ইশারায় ঝাকে ঝাকে ডানা মেলে উড়াল দিচ্ছে আকাশে। তাদের পাখা ঝাপটানির শব্দ আর কলকাকলিতে মুখর হয়ে উঠছে পুরো শান্ত প্রকৃতি। দূর থেকে মনে হয়, যেন আকাশ থেকে সাদা-কালো মেঘের টুকরো নেমে এসেছে বিলের বুকে।
এই পাখিরা কারা?
স্থানীয়দের কাছে এরা পরিচিত ‘শামুকখোল’ বা ‘শামুক ভাঙা’ পাখি নামে। ইংরেজিতে এদের বলা হয় Asian Openbill। এরা মূলত বক জাতীয় বড় আকারের জলচর পাখি। গায়ের রঙ ধবধবে সাদা, তবে ডানার পালক আর লেজের অংশ কুচকুচে কালো। দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো শিল্পী পরম যত্ন নিয়ে সাদা শরীরে কালোর প্রলেপ দিয়েছেন।
কেন এদের নাম ‘শামুকখোল’?
এই পাখির সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এদের অদ্ভুত গড়নের ঠোঁট। ওপরের এবং নিচের ঠোঁটের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা থাকে। এই ফাঁকা ঠোঁটের বিশেষ গঠন এদের প্রিয় খাবার—শামুক ও ঝিনুকের শক্ত খোলস ভাঙতে দারুণভাবে সাহায্য করে। খোলস ভেঙে ভেতরের নরম অংশটি এরা খুব সহজেই বের করে নেয়। এ কারণেই এদের এমন বিচিত্র নাম।
সুবলং কেন এদের প্রিয় গন্তব্য?
বছরের এই সময়ে (সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে) সুবলং বিলের পানি কমে গিয়ে অগভীর জলাশয়ে পরিণত হয়। আর এই কাদাটে পানিতে প্রচুর পরিমাণে শামুক, ঝিনুক, ছোট মাছ, ব্যাঙ আর জলজ কীটপতঙ্গ পাওয়া যায়। খাবারের এই সহজলভ্যতাই হাজার হাজার শামুকখোলকে এখানে টেনে আনে। এরা দলবেঁধে ঘুরতে এবং শিকার করতে পছন্দ করে। ছবিতেও দেখা যাচ্ছে, সবুজ ঘাসের মাঠ আর পানির সংযোগস্থলে তারা বিশাল এক কলোনি তৈরি করে আছে।
পরিবেশ রক্ষায় ভূমিকা ও সংরক্ষণের ডাক শামুকখোল পাখি শুধু দেখতেই সুন্দর নয়, এরা জলাশয়ের বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ক্ষতিকর জলজ কীটপতঙ্গ ও পচা শামুক খেয়ে এরা বিলের পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
সুবলং বিলের এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে টিকিয়ে রাখতে এই পাখিদের সংরক্ষণ অপরিহার্য। পর্যটক ও স্থানীয়দের সচেতনতা এবং পাখিদের বিরক্ত না করা হলে রাঙ্গামাটির এই পাহাড়-ঘেরা জনপদ আগামীতেও এমন মনকাড়া প্রাকৃতিক রূপের সাক্ষী হয়ে থাকবে।