কাল প্রধানমন্ত্রী চেঙ্গী সেতুর উদ্বোধনের মাধ্যমে দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরন হচ্ছে রাঙ্গামাটির ৩ উপজেলাবাসীর

169

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাঙ্গামাটিঃ-অবশেষে স্বপ্ন পূরণ হচ্ছে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচরবাসীর। রাঙ্গামাটিসহ সারাদেশে যাওয়ার সহজ পথ স্বপ্নের নানিয়ারচর চেঙ্গী সেতুর উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কাল বুধবার (১২ জানুয়ারী) সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভার্চুয়াল প্লাটফর্মে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে এই সেতুটি উদ্বোধন করবেন তিনি। সেনাবাহিনীর ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটেলিয়ান (ইসিবি) সেতুটি নির্মান করেছে।
এদিকে এই সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে সেতু এলাকায় উৎসবের আমেজ বইছে। শত শত লোক সেতুর দুই প্রান্তে অবস্থান করছেন এখন। নানান রঙে সাজানো হয় সেতুটিকে এবং বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে সেতুর আদলে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন এই নানিয়ারচর সেতুটি। উদ্বোধন উপলক্ষে রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার নানিয়ারচর সেতু এলাকায় আয়োজন করা হয়েছে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের। যেখানে উপস্থিত থাকবেন রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসনসহ জনপ্রতিনিধিরা, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা।
এই নানিয়ারচরে চেঙ্গী সেতুটি চালু হওয়ায় এই অঞ্চলের মানুষের পারাপারের যে ভোগান্তি ছিল, তার অবসান হচ্ছে। ঢাকার সঙ্গে এ অঞ্চলের নিবিড় যোগাযোগ ব্যবস্থা স্থাপন হবে। ব্যবসা-বাণিজ্যের আরও উন্নতি ও অগ্রগতি হবে এবং পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। পর্যটন সাজেক যেতে দূরত্ব কমে আসবে। অপার সম্ভাবনার দ্বার খুলে যাচ্ছে নানিয়ারচরের অর্থনৈতিক দিকগুলোর, ইতোমধ্যে দৃষ্টিনন্দন এ সেতুটি এখন একটি বিনোদন কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ভ্রমণ পিপাসুদের পদচারণায় মুখর থাকে নানিয়ারচর সেতু এলাকার দুই প্রান্ত।
পার্বত্য রাঙ্গামাটি জেলার নানিয়ারচর উপজেলার চেঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণ হয়েছে এই সেতুটি। প্রকল্পে সেতুটির নামকরণ ‘সেতু’ কিন্তু স্থানীয় ভাবে বলা হয় ‘নানিয়ারচর ব্রিজ’। আর সড়ক পথে যোগাযোগ রাঙ্গামাটি জেলার সাথে নানিয়ারচর চেঙ্গী সেতু দিয়ে যাতায়াত করা যাবে, লংগদু, বাঘাইছড়ি উপজেলাসহ খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালার উপজেলাতেও। এই সেতুর মাধ্যমে অল্প সময়ে দীঘিনালা হয়ে দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট সাজেকে যাওয়া যাবে। তেমনী পাহাড়ের ব্যবসা-বাণিজ্যের অগ্রগতি যেমন হবে তেমনি পর্যটন শিল্পের ঘটবে বিকাশ। তাই চেঙ্গী সেতু উদ্বোধনকে ঘিরে নানিয়ারচরে বইছে উৎসবের আমেজ।
সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তথ্য মতে, ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্য ও ১০ দশমিক ২ মিটার প্রস্থের এই সেতু নির্মাণে প্রায় ১২০ কোটি টাকা খরচ হচ্ছে। আর দুই কিলোমিটার সড়ক সংযোগের জন্য ১০০ কোটি টাকা ব্যয় করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৪৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা ভূমি অধিগ্রহণের জন্য ব্যয় করা হয়। ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর সেতুর নির্মাণ কাজ শুরু হয়।
এদিকে, দেশের অন্যতম পর্যটন স্পট সাজেক, রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলায় অবস্থিত হলেও সড়ক পথে যেতে হয় খাগড়াছড়ি জেলা দিয়ে। এতে একদিকে সময় যেমন বেশি লাগছে অন্যদিকে রাঙ্গামাটিতে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ভোগান্তিও পোহাতে হয়। নানিয়ারচরের চেঙ্গি নদীর সেতু দিয়ে রাঙ্গামাটি থেকে সাজেক যাওয়া যেমন সহজ হবে তেমন যাতায়াত খরচাসহ সময়ও কম লাগবে। তবে নানিয়ারচর থেকে লংগদু ১৮ কিলোমিটারের সড়কটি এখনও নির্মিত না হওয়ায় লংগদু ও বাঘাইছড়িবাসীরা সেতু উদ্বোধনের পরেও এই সুবিধা পাচ্ছেন না।
এই বিষয়ে সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহে আরেফিন জানান, চেঙ্গী সেতু উম্মুক্ত করে দেয়া হলেও এই সেতু দিয়ে এখন লংগদু ও বাঘাইছড়িবাসী সুবিধার আওতায় আসছে না। কারণ এই দুই উপজেলায় সড়কটি নির্মাণে সেনাবাহিনীর ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্স্ট্রাকশন ব্যাটালিয়ন (ইসিবি) থেকে একটি প্রকল্প প্রস্তত করা হচ্ছে। শিগগিরই লংগদু সড়কটির নির্মাণ কাজ শুরু করা হবে।
রাঙ্গামাটি-নানিয়ারচর-লংগদু-বাঘাইছড়ি সড়ক যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ১৯৯৩ সালে নানিয়ারচর অংশে চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছিল। অবশেষে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নানিয়ারচরের চেঙ্গী নদীর ওপর সেতু নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছিলেন। মন্ত্রীর ঘোষণার দুই বছর পর ২০১৭ সালের ১৬ নভেম্বর সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে শুরু হয় সেতু নির্মাণের কাজ। এটি বাস্তবায়নে কাজ করছে সেনাবাহিনীর ১৯ ইঞ্জিনিয়ারিং কন্সট্রাকশন ব্যাটেলিয়ান (ইসিবি)।
নানিয়ারচর উপজেলা চেয়ারম্যান প্রগতি চাকমা বলেন, এই এক সেতুর মাধ্যমে আমাদের অনেক দিনের স্বপ্ন পূরণ হতে চলেছে। আমরা এখন খুব সহজেই জেলা সদরে যাতায়াত করতে পারবো। তাছাড়া এলাকার উৎপাদিত কৃষি পণ্যে আনারস পরিবহন ও বাজারজাত সহজ হবে। একই সঙ্গে বাকি দুই উপজেলা লংগদু, বাঘাইছড়ি হয়ে আমরা সাজেকেও চলে যেতে পারবো। এই সেতু দিয়ে লংগদু দীঘিনালা হয়ে সহজে সাজেকেও যাওয়া যাবে।
এ বিষয়ে নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার শিউলি রহমান তিন্নি জানান, উদ্বোধনের সব প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। ১২ জানুয়ার সকাল ১০টায় ভার্চুয়াল প্লাটফর্মের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক সেতুটি উদ্বোধন শেষে যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে।
উল্লেখ্য, রাঙ্গামাটি থেকে বর্তমানে বাঘাইছড়িতে সড়ক পথে যেতে পাড়ি দিতে হয় প্রায় ১৫০ কিলোমিটার পথ। সময় লাগে প্রায় ছয় থেকে ঘণ্টা। তাছাড়া সরাসরি বাস সার্ভিস চালু না থাকায় সময় আরও বেশি লাগে। তাই কাপ্তাই হ্রদ সৃষ্টির পর নৌ-পথে উপজেলাবাসীকে জেলায় যাতায়াত করতে হয়। তাতেও সময় লাগে অনেক, এই সেতুটি হওয়ায় ফলে দূর্গম উপজেলা লংগদু ও বাঘাইছড়ির জনসাধারণের জন্য কৃষি পন্যসহ জেলার আইন-আদালত কার্যক্রম শেষে, দিনে দিনে কাজ সেরে ঘরে ফেরা সম্ভব হবে।