॥ কাজী মোশাররফ হোসেন, কাপ্তাই ॥
বাংলাদেশের শহর বন্দর গ্রাম গঞ্জের আনাচে কানাচে সর্বত্র অসংখ্য মসজিদ রয়েছে। স্থাপত্যশৈলীর দিক দিয়ে অনেক মসজিদ আছে যেগুলো অতুলনীয়। আবার প্রায় ৪ বছরের পুরাতন মসজিদও রয়েছে বাংলাদেশে। তবে স্তম্ভবিহীন বাংলাদেশের একমাত্র মসজিদটি রয়েছে কাপ্তাই উপজেলার চন্দ্রঘোনায়। স্থাপত্যশৈলীর দিকদিয়ে বর্ণনা করারমত মসজিদটিতে তেমন কোন আকর্ষন নেই। দুর থেকে দেখলেও এই মসজিদটির তেমন কোন আকর্ষনীয় রুপ লাবণ্য চোখে পড়ারমত নয়। তারপরও এই মসজিটিই বাংলাদেশের একমাত্র স্তম্ভবিহীন মসজিদ। মসজিদটির আয়োতন ১৩ হাজার বর্গফুট। মসজিদের ভেতরে মোট ২২টি কাতার রয়েছে। প্রতিকাতারে প্রায় ১৫০জন মুসল্লী একসাথে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারছেন। ২২ কাতারে একসাথে ৩ হাজার মুসল্লী নামাজ আদায় করতে পারবেন। এই মসজিদের অন্যতম আকর্ষণ হলো মসজিদের ভেতরে কোথাও কোন পিলার বা স্তম্ভ নেই। শুধুমাত্র ৪ দেওয়ালের উপর ভর করে দাঁড়িয়ে আছে এই মসজিদ। মসজিদে সমবেত ৩ হাজার মুসল্লীর সবাই যে প্রান্তেই বসেননা কেন ইমাম সাহেবকে স্পষ্ট দেখা যায়। অর্থাৎ পিলার বা স্তম্ভ না থাকাটাই মসজিদটির একমাত্র ও প্রধান আকর্ষন। তবে শুধু পিলার বা স্তম্ভ নেই বলার মধ্যেই এর আকর্ষন সীমাবদ্ধ নেই। মসজিদের উপরে সিলিংয়ে মোট ৮৭টি বৈদ্যুতিক পাখা রয়েছে। ৩৬টি টিউব লাইট এবং ৩৬টি গোলাকার বাল্ব মসজিদের সিলিংয়ে ঝুলে আছে। পিলার বা স্তম্ভবিহীন এতবড় ছাদ কিভাবে এতগুলো সিলিং ফ্যান ও বাতি নিয়ে ঝুলে আছে এটাই সবাইকে অবাক ও আকৃষ্ট করে। এই মসজিদের বারান্দায় ৫টি কাতার রয়েছে। এইসব কাতারেও অনুরুপ ১৫০ জন করে মুসল্লী অনায়াসে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন। তবে বারান্দা থেকে মসজিদের ভেতরে প্রবেশের জন্য ৯টি বিশালাকার দরোজা আছে। বিশাল দরোজা থাকার কারণে বারান্দায় বসেই ইমাম সাহেবকে দেখা যায় এবং তাঁর বাণী এবং ওয়াজ শোনা যায়। মসজিদের বারান্দায়ও অনেকগুলো ফ্যান ও বাতি রয়েছে। মূল মসজিদে প্রবেশের জন্য আকর্ষনীয় তিনটি গেইট বা ফটক রয়েছে। স্তম্ভবিহীন কেপিএম জামে মসজিদের কথা বাংলাদেশের অনেকেই অবগত আছেন। ‘স্তম্ভবিহীন’ এই শব্দটির জন্য দুর দুরান্ত থেকে অনেক মুসল্লি দেখতে এবং একবার নামাজ আদায় করতে এই মসজিদে আসেন। দীর্ঘ প্রায় ৬০ বছর ধরে স্তম্ভবিহীন থাকার নান্দনিকতা ধরে রাখতে পেরেছে এই মসজিদ।
মসজিদে বর্তমানে ইমামতি করছেন আলহাজ্ব এটিএম মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ। তিনি জানান কেপিএম ব্যাবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এই মসজিদ পরিচালনা করছেন। ১৯৬৭ সালের ৮ ডিসেম্বর এবং ১৩৮৭ হিজরির ৫ রমজান এই মসজিদটি উদ্বোধন করেন তৎকালিন দাউদ গ্র“ব অব ইন্ডাষ্ট্রিজের চেয়ারম্যানের আহমেদ দাউদ এইচ কে এর মাতা হাজিয়ানী হানিফা বাই।
কেপিএম অভ্যন্তরিন প্রধান সড়কের পাশে অবস্থিত এই মসজিদে কর্ণফুলী পেপার মিল এবং কর্ণফুলী রেয়ন মিলের সকল শ্রমিক কর্মচারি কর্মকর্তা এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। বাংলাদেশের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিও এখানে নামাজ আদায় করেছেন। ১৯৮৫ সালে তৎকালিন রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ একবার চন্দ্রঘোনাস্থ কর্ণফুলী পেপার মিল পরিদর্শনে এসে এই মসজিদে নামাজ আদায় করেছিলেন বলে জানা গেছে। এই মসজিদের প্রথম ইমাম ছিলেন মাওলানা মোঃ ফজলুর রহমান। পরবর্তীতে মাওলানা আব্দুল মান্নান, মাওলানা মোঃ নজরুল ইসলামসহ আরো অনেকেই এই মসজিদে ইমামতি করেছিলেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এই মসজিদে পবিত্র রমজান মাসে খতমে তারাবি অনুষ্ঠিত হতো। কর্ণফুলী রেয়ন মিলের সাবেক সিবিএ নেতা মোঃ ইসমাইল ফরিদ জানান, শুরুতে এই মসজিদে পবিত্র রমজান মাসে শব-ই ক্বদর এর আগের ৩ দিন তারাবী নামাজ শেষে উপস্থিত সকল মুসল্লিদের চা এবং কেপিএম ক্যান্টিনে উৎপাদিত বিস্কুট পরিবেশন করা হতো। ইমামদের সারা রমজান মাস জুড়ে কেপিএমের পক্ষ থেকে রাতে এক গ্লাস করে গরুর দুধ সরবরাহ করা হতো। প্রতি শবেবরাত এবং ঈদ ই মিলাদুন্নবী উপলক্ষে মসজিদে বিশেষ দোয়া এবং মোনাজাত করা হতো। তখন উপস্থিত মুসল্লীদের সবাইকে কেপিএমের পক্ষ থেকে উন্নত মানের লাড্ডু, মিহিদানা, বরফি ইত্যাদি পরিবেশন করা হতো।
তবে দীর্ঘ ৬০ বছরের পরিক্রমায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। কর্ণফুলী পেপার মিলের আগেকার সেই জৌলুস আর নেই। কেপিএম নিজেই এখন নানা প্রকার সংকটের মধ্য দিয়ে দিনাতিপাত করছে। একসময় স্থায়ী ইমাম ও মুয়াজ্জিনসহ বেশ কয়েকজন খাদেম এই মসজিদে কর্মরত ছিলেন। এখন মসজিদে কেউই স্থায়ী নেই। দৈনিক ভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে ইমাম ও মুয়াজ্জিন মসজিদে কর্মরত আছেন।
কর্ণফুলী পেপার মিলের ব্যাবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ শহীদ উল্লাহ্ জানান, অনেক প্রতিকুলতার মধ্যেও কেপিএম কর্তৃপক্ষ মসজিদের ইমাম মুয়াজ্জিনদের অস্থায়ী ভিত্তিতে হলেও নিয়োগ দিয়েছে। তবে মসজিদে সার্বক্ষনিক বিদ্যুৎ সরবরাহ, পানি পরিবেশন এবং ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের আবাসন ব্যবস্থা কেপিএম কর্তৃপক্ষ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত রেখেছে। কেপিএম নিয়েও অনেক পরিকল্পনা বর্তমান সরকারের রয়েছে। কেপিএম আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারলে এবং সুদিনের দেখা পেলে কেপিএম কেন্দ্রীয় জামে মসজিদও যথাযথভাবে যাতে ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেই ব্যবস্থা তখনকার কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করবেন বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
