সাফজয়ী ঋতুপর্ণা চাকমার মা ক্যান্সারে আক্রান্ত, অর্থাভাবে করতে পারছেনা চিকিৎসা, পূরণ হয়নি সরকারী নানা আশ্বাস

144

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
পাহাড়ের কৃতি সন্তান বাংলাদেশের জাতীয় নারী ফুটবল দলের অন্যতম খেলোয়ার ঋতুপর্ণা চাকমা যখন দেশের নারী ফুটবল দলকে বিশ্বে অন্যতম উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছে, ঠিক তখনই দেশের এই কৃতি ফুটবলার ঋতুপর্ণার মা ভূজোপতি চাকমা কঠিন রোগে আক্রান্ত।
তিনি ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত বলে জানিয়েছেন ঋতুপর্ণার বোন পাম্পী চাকমা। তার মা জানেন না কিনি ভয়াল একটি রোগে আক্রান্ত। অর্থের অভাবে আধুনিক উন্নতমানের চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত রত্নগর্ভা এই মা। দেশের এই কৃতি ফুটবলারের মায়ের চিকিৎসা সেবায় সরকার এবং দেশের মানুষের সহায়তা চেয়েছেন ঋতুপর্নার বোন। পাশাপাশি সরকারের দেয়া আশ্বাস অনুযায়ী চান তাদের বিধ্বস্ত ভাঙ্গা ঘরের পরিবর্তে নতুন ঘর, এলাকার রাস্তা ও পরিবারের বেকার বোনদের সরকারী চাকরী।
সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর পাহাড়ের কৃতি ফুটবলারদের নানা সংকট নিরসনে সরকারের দেয়া আশ্বাস পূরণ হোক এটা চান পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঋতুপর্ণাদের খুজে বের করে আনা ক্রীড়া সংগঠক ও মঘাছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাক্তণ প্রধান শিক্ষক বীর সেন চাকমা। দারিদ্রের কষাঘাতে হারিয়ে না যাক পাহাড়ের এই রত্ন এমনটাই দাবী সকলের।
রাঙ্গামাটি শহর থেকে কাউখালী উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ী এলাকার মগাছড়িতে জন্ম পাহাড়ের রত্ন জাতীয় নারী ফুটবলার ঋতুপর্ণা চাকমার। মুল সড়ক থেকে প্রায় সাড়ে ৩-৪ কিলোমিটার পাহাড়ী এলাকা পায়ে হেটে উঁচুনিচু পাহাড় বেয়ে যেতে হয় ঋতুপর্ণার বাড়ি। সরকারী আশ^াস অনুযায়ী এখনো করা হয়নি দুর্গম এই এলাকার রাস্তা। কষ্ট করে এখনো পায়ে হেটে পাড়ি দিতে হয় এই পাহাড়ী এলাকা।
ঋতুপর্ণার মেজবোন পাম্পী চাকমা বলেন, আমরা চার বোন। একমাত্র ভাই তিন বছর আগে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে মারা গেছে। চার বোনের মধ্যে তিন বোনের বিয়ে হয়ে গেলেও সবারই রয়েছে আর্থিক সমস্যা। ঋতুর ফুটবল খেলা থেকে আয় করা অর্থ দিয়ে চলে আমাদের পরিবার। আমাদের মা দীর্ঘ সময় ধরে দুরারোগ্য ব্যাধি ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত। অর্থের অভাবে পরিবারের পক্ষে মাকে চিকিৎসা করানো যাচ্ছেনা। মায়ের চিকিৎসা সহায়তাসহ কৃতি ফুটবলার ঋতুর পরিবারের সংকট নিরসনে দেশের মানুষসহ সরকারী সহায়তা ঋতুপর্ণার বোন পাম্পী চাকমা।
কথা হয় ঋতুপর্ণা চাকমার মা ভূজোপতি চাকমার সাথে। কোন রকম বিছানায় বসতে পারেন তিনি। মেয়ে ঋতুপর্ণা চাকমার খেলা দেখে খুশি তিনি। মেয়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন তিনি, তার আশা মেয়ে ঋতু একদিন বিশ^ জয় করবে। তবে তিনি যে একটি দূরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত তা তিনি জানেন না।
ঋতুপর্ণা চাকমার মা ভূজোপতি চাকমা জানান, আমি ভালো নেই। ডাক্তারের সেখানে গিয়ে কেমোথেরাপি মেরেছি ৩টা। তবুও ভালো হচ্ছি না। কি অসুক হয়েছে বলতে পারছি না। আর আমার মেয়ে ঋতুপর্ণার ঘর তৈরী করে দেয়ার যে সরকারের আশ^াস তা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি। প্রশাসন এসেছে, দেখেছে, মাপঝোক নিয়েছে। কিন্তু এখনো কিছুই করে দেয়নি। আমার মেয়ে ও দুই মেয়ের স্বামীদের জন্য যাতে চাকুরীর ব্যবস্থা করে দেয় সরকার এই অনুরোধ করছি। আর পাশাপাশি নির্মাণ করা হয়নি গ্রামের নতুন রাস্ত। সরকারী আশ^াস অনুযায়ী সকল সমস্যা নিরসনের দাবি জানিয়েছেন ঋতুপর্ণা চাকমার মা ভূজোপতি চাকমা।
পাহাড়ের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে ঋতুপর্ণা চাকমা, মনিকা চাকমা,আনাই মঘিনি, আনু মঘিনি, রুপনা চাকমাসহ শত শত খেলোয়ার যার হাত ধরে তৈরী হয়েছে তিনি হলেন রাঙ্গামাটি মঘাছড়ি সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় সাবেক প্রধান শিক্ষক ও রাঙ্গামাটির ক্রীড়া সংগঠক বীর সেন চাকমা। তিনি বলেন, সাফ জিতে আসার পর নিজের সাংসারিক অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি দেশের অন্যতম কৃতি ফুটবলার ঋতুর। ঋতুপর্ণা চাকমার মায়ের সুচিকিৎসাসহ ঋতুপর্ণার সকল সংকট নিরসনে বর্তমান সরকারকে এগিয়ে আসার জন্য তিনি অনুরোধ জানান। তাছাড়া পাহাড়ে ছড়িয়ে থাকা আরো মেধাবী খেলোয়ার তৈরীতে সরকারকে উদ্যোগ গ্রহন করার আহবান জানান এই ক্রীড়া সংগঠক।
২০১৫ সালে ক্যানসারের মারা যান ঋতুপর্ণার বাবা বরজ বাঁশি চাকমা। বাবার অণুপ্রেরণায় ফুটবলে এসেছেন ঋতুপর্ণা। পাশাপাশি চালিয়ে যাচ্ছেন পড়াশোনা। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন বিভাগে পড়ছেন এই তারকা ফুটবলার।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ রুহুল আমিন বলেন, ঋতুপর্ণার মায়ের বিষয়ে আসলে আমরা জানতাম না। ঋতুপর্ণাও আমাদেরকে অবহিত করেনি। গণমাধ্যমের মাধ্যমে জানতে পেরেছি যে তার পরিবারিক এমন অবস্থায় রয়েছে। যেহেতু বিষয়টি আমরা অবগত হয়েছি ঋতুপর্ণা দেশে এসেছে। সে এখানে আসলে আমরাই তার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করবো। তার আবেদন নিয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে দ্রুততার সাথে সরকারী সহযোতা যাতে পায় তার জন্য আমরা নিশ্চিত করবো। এর পাশাপাশি তার সাথে আমরা যোগাযোগ করে স্থানীয় ভাবে যতটুকু সহায়তা করা যায় প্রশাসন থেকে এই ব্যবস্থা করা হবে।
ঘর করে দেয়ার ব্যাপারে তিনি আরো বলেন, আপনারা জানেন যে ঋতুপর্ণার জন্য একটি ঘর করে দেয়ার জন্য ১২ শতক খাসজমি বন্দোবস্তির প্রস্তাব প্রক্রিয়াধীন রয়েছে এবং এটা যথাযথ প্রক্রিযায় এই মুর্হুতে মন্ত্রণালয়ে প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। আইনানুক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে জমি বন্দোবস্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এর পাশাপাশি আমরা চেষ্টা করেছি তাকে ঘর নির্মাণের জন্য আর্থিক বরাদ্দ দিয়েছি এবং ঋতুপর্ণার সাথে আমরা যোগাযোগ করেছি। আমরা ভবিষ্যতে ঋতুপর্ণার ঘর সম্পন্ন করতে সরকারের যে আর্থিক সহায়তা সেই বিষয়টাও আমরা অব্যাহত রাখবো।
সাফ জিতে আসার পর নিজের সাংসারিক অবস্থার তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি দেশের অন্যতম কৃতি ফুটবলার ঋতুর। এবারও এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপ বাছাইয়ের চুড়ান্ত পর্বে জায়গা নিশ্চিত করেছে তিনি। বিশেষ করে দ্বিতীয় ম্যাচে মিয়ানমারকে হারিয়েছে ২-১ গোলে। দুটি গোলই করেছেন ঋতুপর্ণা চাকমা। দেশের ফুটবলকে অন্যতম উচ্চতায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ঋতুপর্ণারা দারিদ্রতার কষাঘাতে হারিয়ে যাবেনা এমনটাই প্রত্যাশা সকলের।