বিলাইছড়িতে দুর্গম ও প্রতিকূল পরিবেশে কৃষি জরিপ করতে হাঁপিয়ে যাচ্ছেন কৃষি কর্মকর্তারা

25

॥ সুজন কুমার তঞ্চঙ্গ্যা, বিলাইছড়ি ॥
পাহাড়ে কৃষি বিষয়ক তথ্য বা কৃষি জরিপ করতে গিয়ে চরম অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে তথ্য সংগ্রহকারীদের। যাদের অভ্যাস নেই তারা হাপিঁয়ে যাচ্ছেন। রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় কৃষি অফিসের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সঙ্গে কিছু এলাকায় গিয়ে জানতে পারা যায়।
প্রবল বর্ষণ, পাহাড়ি ছড়ার উচ্ছ্বসিত স্রোত, পিচ্ছিল পাহাড়ি পথ, নেই যানবাহন, নেই মোবাইল নেটওয়ার্ক। এমন প্রতিকূল পরিবেশেও কাঁধে ব্যাগ, হাতে কাগজপত্র ও মোবাইল নিয়ে কৃষকের বাড়ির পাহাড়ী পথে হাঁটছেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা। ১৮০০-২০০০ ফুঁট পর্যন্ত পাহাড়ে চূড়ায় গিয়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। কারণ কৃষকের সঠিক তথ্য সংগ্রহ করা তাদের সরকারি দায়িত্ব। দেশের কৃষি উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে ওঠে মাঠ পর্যায়ের তথ্যের ওপর। সেই তথ্য সংগ্রহে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
দুর্গম পাহাড়, নদী, খাল, ছড়া, কাদা ও ঝুঁকিপূর্ণ পথ অতিক্রম করে তারা প্রতিদিন কৃষকের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছেন। অনেক সময় ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে একটি গ্রামে পৌঁছাতে হয়। ঝড়-বৃষ্টি কিংবা বৈরী আবহাওয়াও তাদের দায়িত্ব পালনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। পথহারা পথিক হয়ে পড়েন। সমতল হতে পাহাড়ে। পাহাড় হতে পাহাড়ে। বিশেষ করে পার্বত্য অঞ্চলে এই ‘দায়িত্ব আরও কঠিন। কোথাও নৌকায়, কোথাও মোটরসাইকেলে, আবার কোথাও দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হয়। পাহাড় ধস, দুর্ঘটনা, সাপ বা বন্য প্রাণীর ঝুঁকি সবকিছুর মধ্যেও তারা নিরলসভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এই কঠিন দায়িত্ব পালনে নেই কোন পর্যাপ্ত সরকারি লজিস্টিক সহায়তা বা প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ। যাতায়াত, জ্বালানি, নৌকা ভাড়া, মোবাইল ও ইন্টারনেট খরচসহ নানা ব্যয় নিজেদের পকেট থেকেই বহন করতে হচ্ছে। অথচ এসব তথ্যের ভিত্তিতেই কৃষি প্রণোদনা, ভর্তুকি, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সহায়তা এবং জাতীয় কৃষি পরিকল্পনার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয় ।
একাধিক উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তারা জানান, সরকারি দায়িত্ব মনে করেই আমরা সব প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে কৃষকের কাছে যাই। কিন্তু মাঠের বাস্তবতা অনেক কঠিন। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করলেও সেই ঝুঁকির তুলনায় আমরা প্রয়োজনীয় সহায়তা পাই না। বর্তমানে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাগণ ধাপে ধাপে একটি একটি করে ব্লকের কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের কাজ করছেন। এর ফলে একজন উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে নিজের নির্ধারিত ব্লকের পাশাপাশি উপজেলার বিভিন্ন ব্লকের প্রত্যন্ত গ্রামগুলোতেও যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় যাতায়াতের ক্ষেত্রে সময়, শ্রম ও অর্থ তিনটিই বেশি ব্যয় হচ্ছে। একজন কর্মকর্তাকে বারবার দূরবর্তী এলাকায় যেতে হওয়ায় যাতায়াত খরচ, সময়ের অপচয় এবং দৈনন্দিন দাপ্তরিক কাজের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। এক্ষেত্রে যদি যে ব্লকের দায়িত্বে যে উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা রয়েছেন, তাকে শুধুমাত্র তার নিজ দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্লকের কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের দায়িত্ব দেওয়া হয়, তাহলে তিনি তার এলাকার কৃষকদের সম্পর্কে অধিকতর ভালোভাবে জানেন এবং দ্রুত ও নির্ভুলভাবে তথ্য সংগ্রহ করতে পারবেন। উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত অর্থ ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে, সময় ও শ্রমের সাশ্রয় হবে, দুর্গম এলাকায় বারবার যাতায়াতের ঝুঁকি কমবে, কৃষকের তথ্য আরও দ্রুত ও নির্ভুলভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হবে, প্রত্যেক কর্মকর্তা নিজ নিজ ব্লকের কাজের প্রতি আরও বেশি দায়িত্বশীল হতে পারবেন, একই সঙ্গে মাঠ পর্যায়ের অন্যান্য কৃষি কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে পরিচালনা করা সহজ হবে।
অতএব, কৃষক তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে ব্লকভিত্তিক দায়িত্ব বণ্টন করে সংশ্লিষ্ট ব্লকের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তাকে নিজ নিজ ব্লকের কাজ সম্পাদনের সুযোগ দেওয়া হলে অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ের কার্যক্রম আরও গতিশীল, কার্যকর ও সুশৃঙ্খল হবে।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, মাঠ পর্যায়ের এই কর্মকর্তারাই কৃষি সম্প্রসারণ ব্যবস্থার প্রাণ। তাদের সংগ্রহ করা তথ্য ছাড়া কৃষি খাতের সঠিক পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। তাই তাদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, পর্যাপ্ত যাতায়াত ভাতা, আধুনিক সরঞ্জাম এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের জন্য বিশেষ ভাতা নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষকের মুখে হাসি ফোটাতে যারা নীরবে কাজ করে চলেছেন, তাদের কষ্ট ও ত্যাগ যেন আড়ালেই থেকে যায়। রাষ্ট্রের উচিত এই নীরব যোদ্ধাদের অবদান যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা এবং দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা। কারণ, মাঠে উপ-সহকারী কৃষি অফিসারদের পদচারণা যত শক্তিশালী হবে, দেশের কৃষি ততই সমৃদ্ধ হবে এবং কৃষক পাবেন আরও কার্যকর সরকারি সেবা।
কৃষি অফিসার রাজেশ প্রসাদ রায় এবং ওমর ফারুক জানান, নির্ভুল তথ্য সংগ্রহের জন্য নিয়মিত দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তবে সমতলের তুলনায় পাহাড়ে এভাবে তথ্য সংগ্রহ করা সম্পূর্ণ ভিন্ন এবং চ্যালেঞ্জিং। এতে তথ্য সংগ্রহ করতে ও দিতে অসুবিধায় পড়েন মাঠ সংগ্রহের পাশাপাশি কৃষকরা। বাড়িতে গেলে একসাথে তাদের পাওয়া যায় না। একজন থাকলে আরেকজন থাকে না। স্বামী থাকলে স্ত্রী থাকেন না। কয়েকবার যেতে হয়। বার বার যেতে হয়।
স্থানীয় জন প্রতিনিধিরা জানান, সবার মতামতের ভিত্তিতে একটা সুবিধাজনক স্থানে করলে সবার সুবিধা হয়। এজন্য যতাযত কর্তৃপক্ষের সুদৃষ্টি প্রয়োজন।