॥ থানচি প্রতিনিধি ॥
বর্ষা এলেই বান্দরবানের থানচি-আলীকদম-লিকড়ি সীমান্ত সড়কের বিভিন্ন স্থানে পাহাড় ধসের কারণে যোগাযোগ ব্যবস্থা বারবার বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে দুর্ভোগে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দা, পর্যটক, শিক্ষার্থী এবং জরুরি সেবাগ্রহীতারা। বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের ঢালে জুম চাষের জন্য নির্বিচারে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া এবং মাটির উপরিভাগ নষ্ট করাই ভূমিধসের অন্যতম প্রধান কারণ।
এ প্রেক্ষাপটে থানচি উপজেলার সীমান্ত সড়ক (থানচি-লিটক্রে সড়ক) সংলগ্ন উভয় পার্শ্বের ঢালে জুম চাষের উদ্দেশ্যে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া এবং পাহাড়ের স্থিতিশীলতা নষ্ট করতে পারে-এমন সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়ে গণবিজ্ঞপ্তি জারি করেছে উপজেলা প্রশাসন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল স্বাক্ষরিত গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সড়কের উভয় পাশের ঢালে গাছ কাটা, আগুন দেওয়া, মাটির উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত করা কিংবা ভূমিধসের ঝুঁকি সৃষ্টি হতে পারে—এমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করা যাবে না। নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খোজ নিয়ে জানা যায়, বর্ষা মৌসুমে অতিবৃষ্টি হলে পাহাড়ি ঢালের মাটি আলগা হয়ে সড়কের ওপর ধসে পড়ে। ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, কখনো কয়েক দিন পর্যন্ত যান চলাচল বন্ধ থাকে। এতে খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়। দুর্গম এলাকার রোগীদের হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে। পাহাড়ের প্রাকৃতিক বৃক্ষ ও ঘাসের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে। কিন্তু জুম চাষের প্রস্তুতির সময় এসব গাছপালা কেটে আগুনে পুড়িয়ে ফেললে মাটির বন্ধন দুর্বল হয়ে যায়। এরপর ভারী বৃষ্টিতে সহজেই পাহাড় ধসে পড়ে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবদুল্লাহ-আল-ফয়সাল বলেন, সীমান্ত সড়কটি কেবল একটি যোগাযোগ মাধ্যম নয়, এটি এলাকার মানুষের জীবন-জীবিকা ও নিরাপত্তার সঙ্গে জড়িত। পাহাড় কেটে বা গাছ পুড়িয়ে জুম প্রস্তুত করলে ভূমিধসের ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তাই জনস্বার্থে এ ধরনের কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। কেউ নির্দেশনা অমান্য করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানুষের নিরাপত্তার স্বার্থে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, কারবারি, হেডম্যান এবং সংশ্লিষ্ট সবাইকে সচেতনতার মাধ্যমে এগিয়ে আসতে হবে।
থানচি সদর ইউপি চেয়ারম্যান অংপ্রু ম্রো বলেন, পাহাড় রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি। জুম চাষ পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবিকা হলেও সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে পাহাড়ের ঢালে গাছ কেটে আগুন দিয়ে জমি প্রস্তুত করলে তা পুরো এলাকার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পর্দ্দা মৌজা হেডম্যান হাবরু ম্রো বলেন, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব বিকল্প পদ্ধতিতে জুম চাষের উদ্যোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সচেতনতামূলক প্রচারণা, নিয়মিত নজরদারি এবং আইন প্রয়োগ অব্যাহত রাখার ওপরও তারা গুরুত্বারোপ করেন।
জেলা পরিষদের সদস্য খামলাই ম্রো বলেন,পরিবেশ রক্ষায় সবার দায়িত্ব। পাহাড় শুধু একটি ভূখণ্ড নয়; এটি বন, জীববৈচিত্র্য, পানি সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। পাহাড়ের ঢাল রক্ষা করা গেলে ভূমিধস কমবে, সড়কও টেকসই থাকবে। প্রশাসনের জারি করা গণবিজ্ঞপ্তি বাস্তবায়নে স্থানীয় জনগণ, জনপ্রতিনিধি, জুমচাষি এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগই পারে থানচি-লিটক্রে সীমান্ত সড়ক, থানচি বান্দরবান সড়ক, থানচি আলীকদম সড়ক সমূহের নিরাপদ রাখতে এবং ভবিষ্যতের ভয়াবহ ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে পারে।
