জুরাছড়িতে ইউএনওসহ ১৬টি গুরুত্বপূর্ণ পদ শূন্যঃ সেবা থেকে বঞ্চিত সাধারণ মানুষ

43

॥ সুমন্ত চাকমা, জুরাছড়ি ॥
রাঙ্গামাটির দুর্গম জুরাছড়ি উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)সহ একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ শূন্য পড়ে আছে। প্রশাসন ও সেবামূলক ১৮টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের মধ্যে ১৬টিতেই স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। ফলে পাশের উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের দিয়ে কোনো রকমে চলছে সরকারি কার্যক্রম। এতে প্রয়োজনীয় সেবা পেতে ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ, ব্যাহত হচ্ছে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত ১০ মে পর্যন্ত জুরাছড়ির ইউএনও হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন মো. বায়েজীদ-বিন-আখন্দ। এরপর থেকে কখনো রাঙামাটি সদর, কখনো নানিয়ারচর, বরকল, বিলাইছড়ি বা কাপ্তাই উপজেলার ইউএনওকে অতিরিক্ত দায়িত্ব দিয়ে প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে জরুরি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও জনসেবামূলক কার্যক্রমে বিলম্ব হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
উপজেলা হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার পদও দীর্ঘ ৮ থেকে ১০ বছর ধরে শূন্য। একইভাবে উপজেলা প্রকৌশলী, সমাজসেবা কর্মকর্তা, পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, খাদ্য নিয়ন্ত্রক কর্মকর্তা এবং প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদও দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে সমবায় বিভাগ। এ বিভাগের চারটি পদই খালি। বরকল উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও তিনি মাসে এক-দুদিনের বেশি জুরাছড়িতে আসতে পারেন না। ফলে নতুন সমবায় সমিতি নিবন্ধনসহ নানা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় কর্মকর্তার পদেও চার বছরের বেশি সময় ধরে স্থায়ী কর্মকর্তা নেই। কাউখালী উপজেলা থেকে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন । পরিসংখ্যান কর্মকর্তার পদ প্রায় ১২ বছর ধরে শূন্য। মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পদও সাত বছর ধরে খালি; অফিস পরিচালিত হচ্ছে অফিস সহায়কের মাধ্যমে, আর অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন অন্য উপজেলার শিক্ষা কর্মকর্তা। এ ছাড়া তুলা উন্নয়ন বোর্ডের একটি অফিস থাকলেও সেখানে কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সরকারি কর্মচারী জানান, অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছে কোনো কাজ নিয়ে গেলে প্রায়ই বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। অনেক সময় দূর থেকে গিয়ে কর্মকর্তাদের পাওয়া যায় না, আবার পাওয়া গেলেও জরুরি কাজ শেষ হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।
বনযোগীছড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সন্তোষ বিকাশ চাকমা বলেন, “বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে কর্মকর্তা না থাকায় সরকারের সেবাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে সঠিকভাবে পৌঁছাচ্ছে না। উন্নয়ন কার্যক্রমও স্বাভাবিক গতিতে এগোতে পারছে না।”
জুরাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইমন চাকমা বলেন, “দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো শূন্য থাকায় সাধারণ মানুষ নানা ধরনের সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। জনস্বার্থে দ্রুত এসব পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।”
স্থানীয় হেডম্যান সম্রাট চাকমা বলেন, “দুর্গম এলাকার মানুষ সরকারি সেবার জন্য এমনিতেই অনেক কষ্ট করেন। তার ওপর কর্মকর্তারা নিয়মিত না থাকায় মানুষের ভোগান্তি আরও বেড়ে গেছে।”
নারী ইউপি সদস্য ননাবী চাকমা বলেন, “নারী, শিশু ও দরিদ্র মানুষের জন্য যেসব সরকারি কর্মসূচি রয়েছে, সেগুলোর বাস্তবায়নও কর্মকর্তার অভাবে ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদগুলো পূরণ করা হলে সাধারণ মানুষ সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবে।”
স্থানীয়দের দাবি, জুরাছড়ির মতো দুর্গম উপজেলায় দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদ শূন্য থাকায় প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে। কার্যকর জনসেবা নিশ্চিত করতে এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের গতি ফিরিয়ে আনতে দ্রুত এসব শূন্য পদে স্থায়ী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।