পাহাড় কাটা ও উজাড় হচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের বন, হুমকির মুখে জীববৈচিত্র্য

152

॥ নিজস্ব প্রতিবেদক ॥
একসময় ঘন সবুজে মোড়া ছিল পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়। আদি পদ্ধতির চাষাবাদ, অবাধ বন উজাড় করে ইটভাটা আর কাঠ পাচারে এখন অধিকাংশ পাহাড়ই পরিণত হয়েছে ন্যাড়া ও অনুর্বর ভূমিতে। ফলে বাড়ছে পাহাড় ধস, পানির সংকট, হারিয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। পরিকল্পিত বনায়ন, ফলজ-বনজ গাছ রোপন, হিমাগার স্থাপন, পরিবেশ বান্ধব পর্যটন রির্সোট ও পর্যটন করিডোরে আনা গেলে বদলে যাবে পার্বত্য জনপথ এমন মতামত পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের।
তথ্য সুত্রে জানা যায়, বাংলাদেশের মোট আয়তনের এক-দশমাংশের মতো এলাকা নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম। খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান-পাহাড়ি তিনটি জেলা নিয়ে গঠিত এই অঞ্চল জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। বাংলাদেশের পাহাড়ি বনের ৯০ শতাংশই পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় অবস্থিত এবং দেশের মোট জীববৈচিত্র্যের ৮০ শতাংশের মতো এই সব পাহাড়ে বিদ্যমান।
আর এই পাহাড়ী অঞ্চল শুধু ভৌগোলিকভাবে নয়, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচিত। কিন্তু গত কয়েক দশকে স্থানীয় জীববৈচিত্র্য চরম সংকটময় পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছে। প্রকৃতির ওপর বারবার আঘাতে পার্বত্য চট্টগ্রামের চির সবুজ বনের আয়তন দিন দিন ক্রমশ কমছে। এমন এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতিতে ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন: আজকের পদক্ষেপ, আগামীর নিরাপত্তা এই দিনে পার্বত্য অঞ্চলের বিপন্ন পাহাড়, বন ও বন্যপ্রাণী সুরক্ষা, জলবায়ু সংকট মোকাবেলায় তাৎক্ষনিক ও কার্যকর উদ্যোগ আমাদের নীতি ও কার্যক্রম পুনর্মূল্যায়ন করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মতে, পার্বত্য চট্টগ্রামের বন ও উদ্ভিদ বিপন্ন হওয়ায় এর সামগ্রিক প্রভাব পড়েছে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর। বন উজাড়ের কারণে প্রত্যক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পাখি ও বন্যপ্রাণী। আবাসস্থল ধ্বংস হওয়ায় তারা চরম বিপন্নতার মুখোমুখি। আর বনাঞ্চলের মধ্যে অবৈধ ইট ভাটা ও বন উজার করে অবাধে কাঠ পাচারে কমছে সবুজ পাহাড়, শুকিয়ে যাচ্ছে ঝিড়ি ঝর্ণা আর বাড়ছে পানির সংকট।
আর পাশাপাশি ঝুঁকিতে রয়েছে এশিয়ান বন্য হাতি। পার্বত্য চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের আওতাধীন রাঙ্গামাটির বরকল ও লংগদুতে ১২টি বন্য হাতি রয়েছে। গত ২৬ এপ্রিল একটি এশিয়ান বন্য হাতির মৃত্যু হয়েছে। হাতিটির মৃত্যুর পর পায়ের মাংস ও শুঁড় কেটে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। এর আগে ২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর রাঙ্গামাটিতে পানিতে পড়ে বিরল প্রজাতির একটি গোলাপি হাতির মৃত্যু হয়। যা বনে বন্য প্রাণীরা নিরাপদ নয়। আর এর প্রভাব পড়ছে জীববৈচিত্র্যের ওপর।
সচেতন মহল মনে করছে, পাহাড়, বনভূমি, নদী ও জীববৈচিত্র্য শুধু আমাদের পরিবেশের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, বরং এই অঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। বন উজাড়, জলবায়ু পরিবর্তন, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অসচেতনতার কারণে জীববৈচিত্র্য ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া ঝুঁকির মুখে রয়েছে রাজ ধনেশ, সাম্বার হরিণ, এশিয়ান বন্য হাতি, ভালুক, বনরুই ও মেঘচিতার মতো বন্যপ্রাণী। এর ফলে বহু উদ্ভিদ ও প্রাণীর অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে এবং প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে যেটুকু জীববৈচিত্র্য বিদ্যমান রয়েছে, তা সংরক্ষণ করা জরুরি। বন উজাড় বন্ধের পাশাপাশি বন্যপ্রাণী শিকার ও পাচার বন্ধ করতে হবে। প্রাকৃতিক বন পুনরুজ্জীবিত করতে পারলে পার্বত্য অঞ্চল আবারও জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তারা।