থানচিতে আ’লীগ নেতা সুজনের অবৈধ ইটভাটায় প্রকাশ্যে কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব

68

॥ রাহুল বড়ুয়া ছোটন, বান্দরবান ॥
বান্দরবানের থানচিতে পাহাড়, বন ও ঝিরিঘেরা এই জনপদে পরিবেশ সংরক্ষণের কথা থাকলেও বাস্তবে তার উল্টো চিত্রই দেখা যাচ্ছে। বনবিভাগ, উপজেলা প্রশাসনের নাকের ডগায় থানচির হেডম্যানপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘেঁষে গড়ে তোলা আ’লীগ নেতা আনিছুর রহমান সুজনের মালিকানাধীন (এসবিএম ব্রিকস) অবৈধ ইটভাটায় প্রকাশ্যে চলছে কাঠ পোড়ানোর মহোৎসব। প্রতিদিন বনাঞ্চল থেকে কেটে আনা মনের পর মন কাঠ পুড়িয়ে ইট প্রস্তুত করা হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে নাÑএমন অভিযোগ তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশকর্মীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, থানচি উপজেলার হেডম্যানপাড়ার জনবসতি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও পাহাড়ি বনাঞ্চলের কাছাকাছি স্থানে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটাটি। নিয়ম অনুযায়ী ইটভাটা স্থাপনে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বনবিভাগের অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রাখা বাধ্যতামূলক। অথচ এসব কোনো শর্তই মানা হয়নি বলে অভিযোগ। ভাটাটিতে কয়লার পরিবর্তে দিনের পর দিন জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে কাঠ, যা সরাসরি বন উজাড়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দা উহ্লা অং মারমা বলেন, ইটভাটা থেকে নির্গত ধোঁয়া পাশের পাহাড়ি পাড়া ও সরকারি প্রাইমারি স্কুল প্রতিনিয়ত ঢেকে রাখছে।
স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ধোঁয়ার কারণে শ্বাসকষ্ট, চোখ জ্বালা, মাথাব্যথাসহ নানা স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন তারা। কেউ কেউ বলেন, প্রতিবছর আশপাশের পাড়াগুলোতে জন্মগত ও পরবর্তী প্রতিবন্ধী শিশুর সংখ্যাও বাড়ছে, যার একটি বড় কারণ এই পরিবেশ দূষণ। মংহাইচিং মারমা বলেন, সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-বারবার অভিযোগ জানানো হলেও বনবিভাগ ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা দেখা যাচ্ছে না। হেডম্যানপাড়ার বাসিন্দা অংচিং প্রু মারমা বলেন, উপজেলা সদরে ইউএনও অফিস, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, বিজিবি অফিস থেকে মাত্র ৫’শ মিটার এবং বনবিভাগের অফিস থেকে ২’শ মিটার দূরে থানচি-আলীকদম সড়কের হেডম্যানপাড়া ও স্কুলের পাশে দুইটি ড্রাম চুল্লির ইটভাটাটিতে দিনেরাতে প্রকাশ্যে মন মন কাঠ পোড়ানোর হলেও সংস্থাগুলোর কর্তারা নিরব ভূমিকায় রয়েছে। পাড়ার ৫৫বছরের বৃদ্ধা হ্লানু মারমাও বললেন, প্রশাসনের চোখের সামনেই প্রতিদিন এমন অবৈধ কর্মকান্ড চলছে। পরিবেশবিদদের মতে, বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় কাঠ পোড়িয়ে ইট উৎপাদন স্পষ্টভাবে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বন আইনের লঙ্ঘন। এতে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে পাহাড়ি এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন তারা।
থানচি উপজেলার হেডম্যানপাড়ায় অবস্থিত একটি অবৈধ ইটভাটায় প্রকাশ্যে কাঠ পোড়ানোর বিষয়ে গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বান্দরবান বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোঃ তৌফিকুল ইসলামকে ছবি ও ভিডিও প্রমাণসহ অবগত করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।
এদিকে বন আইন ও পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন অব্যাহত থাকলেও বিভাগীয় বন কর্মকর্তার রহস্যজনক নীরবতা জনমনে ব্যাপক প্রশ্ন ও উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।