॥ থানচি প্রতিনিধি ॥
বান্দরবান দুর্গম থানচি উপজেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সাথে জুড়ে রয়েছেপর্যটনের আপর সম্ভাবনাময় প্রকৃতির রঙে রাঙানো এক অপার সৌন্দর্যের পাথরের ভূমি। পাহাড়, নদী আর পাথরের এক অনন্য মেলবন্ধন গড়ে তুলেছে এই জনপদে। দুই পাহাড়ে প্রাকৃতিক সবুজের বুক ছিঁড়ে বয়ে চলা শংঙ্খ নদী। আর সেই নদীর বুকে দাঁড়িয়ে আছে পাথরে দেশে মুকুটধারী রাজা পাথর স্থানীয় মারমা ভাষা বংড পাথর।
পাথরের অবস্থানঃ-
উপজেলা তিন্দু ইউনিয়নের অবস্থিত ‘বংড পাথর যা স্থানীয়দের কাছে পরিচিত রাজা পাথর নামে। থানচি বাজার থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকায় দুই ঘণ্টার যাত্রা পেরোলেই চোখে পড়ে পাহাড় ঘেরা সাঙ্গু নদীর বুকে উঠে থাকা বিশালাকারের সেই পাথর। ছোট-বড় অসংখ্য পাথরের রাজার দেশ নামে পরিচিত। নীল পানি আর সবুজের ছোঁয়ায় পর্যটকদের কাছে এটি হয়ে উঠেছে আকর্ষণীয় এক ভ্রমণ গন্তব্য। প্রকৃতির এ রূপে বিমোহিত হয়ে প্রতিদিনই বাড়ছে পর্যটকদের ভিড়।
সাংস্কৃতিবিদ ও সাবেক তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান মংপ্রুঅং মারমা ৫৫ তার দাদা দাদি থেকে শুনার কথা বলেছেন, বহু বছর আগে এক সাধক দিব্য জ্ঞান লাভ করে জানতে পারেন শংঙ্খ নদীতে গুপ্তধনের অস্তিত্ব রয়েছে। সেই সন্ধানে তিনি আরাকান থেকে কালাডাইন নদী পাড়ি দিয়ে এসে এক বিশাল পাথরের ওপর ধ্যানমগ্ন হন। পরে ফেরার সময় ভুলবশত তার পাগড়ি ওই পাথরের ওপর রেখেই চলে যান। তাই সেই মুকুট আজও পাথরের চূড়ায় দৃশ্যমান। এ থেকেই পাথরটির নাম হয়েছে ‘বংডহ’—পাথরের রাজা। এটি একটি পবিত্র পাথর। বংডহ ও ক্যহপাজ্জা: স্বং-এই দুই প্রাকৃতিক আকর্ষণ ঘিরে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর এই পাথরের দেশে।
তিনি আরও বলেন, এক সময় পাথরকে পুজা করতো, ভালবাসা মানুষকে পেতে, ব্যবসা সফল হওয়া, জুম চাষ ফলন ভালো হওয়া,বিয়ে অনুষ্ঠান সম্পন্ন করার, ছেরে সন্তান হওযার ইত্যাদি জন্য টাকা পয়সা, ধন, কাপর চোপর ধার নেয়া দেয়া ইত্যাদিতে ধ্যানের মাধ্যমে চাইলে দিতেন সে মুকুটধারী বংড পাথর। কাল পরিবর্তে ফেরত না দেয়া এখন তা পাওয়া যাইনা। তবে নৌ পথে চলাচলের সময় তাকে উপরোক্ত বিষয়ের বিশ্বাস না করলে দুর্ঘটনা কবলে ও পড়ে অনেকে।
তিন্দু ইউপি চেয়ারম্যান ভাগ্য চন্দ্র ত্রিপুরা বলেন,ছোট-বড় অসংখ্য পাথর আর নিসর্গের অপার সৌন্দর্যে ভরপুর এই এলাকাটি এখন পর্যটকদের জন্য এক অনন্য অ্যাডভেঞ্চার স্পট হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে পাথর প্রতি সম্মান ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষায় পর্যটকদের প্রতি আহ্বান জানান এ জনপ্রতিনিধি। সবুজ পাহাড় আর নীল নদীর এই মিলনস্থলে দাঁড়িয়ে বোঝা যায় বাংলাদেশের প্রকৃতি কতটা বৈচিত্র্যময়। থানচির বংড পাথর তাই হয়ে উঠেছে প্রকৃতি প্রেমীদের নতুন ঠিকানা।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাসঃ-
থানচি উপজেলার তিন্দু ইউনিয়নে অবস্থিত “বংড পাথর” বা “রাজা পাথর” একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন। এটি স্থানীয় মারমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে গভীরভাবে জড়িত। নিচে এই পাথরটির ইতিহাস ও তাৎপর্য রয়েছে।
ইতিহাস ও কিংবদন্তি, মারমা সম্প্রদায়ের সাথে সম্পর্কঃ-
বংড পাথর স্থানীয় মারমা আদিবাসীদের জন্য একটি ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক প্রতীক। মারমা সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশ্বাস করেন যে এই পাথরটি তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকে শ্রদ্ধা করে এবং এটি তাদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাক্ষী।
রাজা পাথর নামকরণঃ-
স্থানীয় কিংবদন্তি অনুসারে, এই পাথরটি কোনো এক সময়ের স্থানীয় রাজা বা প্রধান ব্যক্তির সাথে জড়িত। কথিত আছে যে রাজা বা গোত্রপ্রধান এই পাথরের নিচে বসবাস করতেন বা এখানে গুরুত্বপূর্ণ সভা-সমাবেশ করতেন। এজন্য এটি “রাজা পাথর” নামে পরিচিত।
ঐতিহাসিক ঘটনাবলিঃ-
এই পাথরটি পার্বত্য চট্টগ্রামের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও শান্তি প্রক্রিয়ারও সাক্ষী। স্থানীয়রা বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনায় এই পাথরকে কেন্দ্র করে জমায়েত হতেন।
সাংস্কৃতিক ও সামাজিক তাৎপর্যঃ-
সমাবেশস্থল: মারমা সম্প্রদায়ের লোকেরা বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানের জন্য এই পাথরটিকে কেন্দ্র করে জমায়েত হন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য: পাহাড়ি নদী ও সবুজ প্রকৃতির মাঝে অবস্থিত এই পাথরটি পর্যটকদের জন্য আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। স্থানীয় বিশ্বাস: স্থানীয়রা বিশ্বাস করেন যে এই পাথরটি তাদের সৌভাগ্য ও শান্তির প্রতীক।
বর্তমান অবস্থাঃ-
বর্তমানে বংড পাথর বা রাজা পাথরটি স্থানীয়দের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক স্থান হিসেবে রয়ে গেছে। তবে, এর রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রচারের জন্য আরও উদ্যোগ প্রয়োজন। পর্যটন বিকাশের মাধ্যমে এই স্থানটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পরিচিতি পেতে পারে।
উপসংহারঃ-
বংড পাথর বা রাজা পাথর কেবল একটি প্রাকৃতিক পাথর নয়, বরং এটি মারমা সম্প্রদায়ের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের জীবন্ত নিদর্শন। এটি পার্বত্য চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি অংশ। এই ধরনের স্থানগুলি সংরক্ষণ করা এবং এর ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সকল সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
