বৈসাবি উৎসবকে ঘিরে খাগড়াছড়িতে ব্যাপক প্রস্তুতিঃ পাহাড়ি গ্রামগুলো সাজ-সাজ রব

37

॥ খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি ॥
হাতেগোনা আর কটা দিন। তারপরই শুরু হতে যাচ্ছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী বৈসাবি উৎসব। এ বৈসাবি উৎসবের আমেজে খাগড়াছড়ি শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল্লীতেও চলছে আনন্দ উল্লাস। আর এই উৎসবকে ঘিরে উৎসবের নগরে পরিণত হয়েছে পার্বত্য জনপদ খাগড়াছড়ি।
ইতিমধ্যে পাড়া মহল্লায় বৈসাবি ঘিরে চলছে ব্যাপক প্রস্তুতি। চলছে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা, গান বাজনা আনন্দ উল্লাস। বৈসু, সাংগ্রাই ও বিজু উৎসব উপলক্ষে খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত পল্লী হতে শহর ও শহরতলীতে শুরু হয়েছে বিজু মেলা, সাংস্কুতিক অনুষ্ঠান এবং খেলাধুলা। হাট-বাজারগুলোতে পড়েছে কেনা-কাটার ধুম। এবার বৈসাবি’র সাথে ঈদ উল ফিতরের উৎসব যোগ পাহাড়ে উৎসবে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। ফলে খাগড়াছড়িতে সারাবছর কম-বেশি পর্যটকের উপস্থিতি থাকলেও এবার টানা ছুটিতে তা কয়েকগুণ বেশি হওয়ার আশা করছেন সংশিষ্টরা। ইতিমধ্যে খাগড়াছড়ি ও সাজেকের অধিকাংশ হোটেল-কটেজ বুকিং হয়ে গেছে।
বৈসাবি মানেই রঙে বর্ণে বৈচিত্র্যময় এক ঐতিহ্যবাহী উৎসব। বিজু-সাংগ্রাই-বৈসু, যে নামেই বলা হোক না কেনো, এই উৎসব যেনো পাহাড়িদের প্রেরণা-পাহাড়ের জাগরণ। আগামী ১২ এপ্রিল নদীতে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে মূল উৎসব শুরু হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই উৎসব শুরু হয়ে গেছে।
১৯৮৫ সাল থেকে খাগড়াছড়িসহ পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত তিন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের সম্মিলিত উদ্যোগে ‘বৈসাবি’ নামে এ উৎসব পালন করে আসছে। যা সময়ের ব্যবধানে নিজ নিজ সম্প্রদায়ের লোকদের কাছে ‘বৈসাবি’ শব্দটি জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ত্রিপুরা, মারমা ও চাকমা সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব নামে ‘ত্রিপুরা ভাষায় বৈসুক, মারমা ভাষায় সাংগ্রাই এবং চাকমা ভাষায় বিজু’ নামে এ উৎসব পালন হয়ে থাকে। এ তিন সম্প্রদায়ের নিজস্ব ভাষার নামের প্রথম অক্ষর নিয়ে ‘বৈসাবি’ নামকরণ করা হয়। প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের পাশাপাশি পাহাড়ের বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী ঐতিহ্যবাহী দিনটি পালন করে থাকে।
এদিকে বৈসাবি উৎসব শুরু হতে আরো কয়েকদিন বাকী থাকলেও ইতিমধ্যে শহর ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত এলাকায় চলছে ঐতিহ্যবাহী খেলাধুলা। ঘরে ঘরে চলছে পুরাতন বছর বিদায় দিয়ে নতুন বছরকে স্বাগতম জানানোর প্রস্তুতি।
আগামী ১২ এপ্রিল নদীতে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল নিবেদনের মধ্য দিয়ে চাকমা সমপ্রদায় ফুল বিজু পালন করবে। ১৩ এপ্রিল মূল বিঝু আর পরের দিন ১৪ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ বা গজ্জাপয্যা পালন করবে। এ সময় ঘরে ঘরে চলবে অতিথি আপ্যায়ন। একই সাথে ১৩ এপ্রিল ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের হারিবৈসু, বিযুমা, বিচিকাতাল। ফুল বিজু, মূলবিজু ও বিচিকাতাল নামে নিজস্ব বৈশিষ্টতায় এ উৎসবে আনন্দের আমেজ ছড়ায়।
১৪ এপ্রিল মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সাংগ্রাইং উৎসব। মারমা সম্প্রদায়ের সাংগ্রাইং উৎসবকে ঘিরে খাগড়াছড়ি জেলা নানা রং-এ রঙ্গিন হয়ে উঠে। এ উৎসবের অন্যতম আকর্ষণ ছিল মারমা জনগোষ্ঠীর বর্ণাঢ্য সাংগ্রাইং র‌্যালী ও জলকেলি বা জলোৎসব। সকালে বৌদ্ধ বিহারগুলোতে ক্যং ফুল পূজার মধ্য দিয়ে সাংগ্রাই উৎসবের সূচনা হয়।
মারমা সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী জলকেলি বা জলোৎসবে তরুণ-তরুণীরা একে অপরের দিকে পানি নিক্ষেপ করে উল্লাস প্রকাশ করে। মারমা জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস এই পানি উৎসবের মধ্যদিয়ে অতীতের সকল দুঃখ-গ্লানি ও পাপ ধুয়ে-মুছে যাবে। সে সাথে তরুণ-তরুণীরা একে অপরকে পানি ছিটিয়ে বেছে নেবে তাদের জীবন সঙ্গীকে।
খাগড়াছড়ির আলুটিলার রহস্যময় সুড়ঙ্গ, রিছাং ঝর্ণা, শান্তিপুর অরণ্য কুটিরসহ বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্র। অপর দিকে মেঘের রাজ্য সাজেক রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়িতে অবস্থিত হলেও সেখানে যেতে হয় খাগড়াছড়ি হয়ে। ফলে সাজেকগামী পর্যটকরাও সুযোগে ঘুরে যান খাগড়াছড়ি। সাজেকে বর্তমানে প্রায় ১২০টির মত কটেজ-রিসোর্ট রয়েছে।
সাজেক কটেজ মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক জেরি লুসাই বলেন, আগামী ১১ এপ্রিল থেকে প্রায় এক সপ্তাহ টানা বুকিং রয়েছে। পর্যটক বরণে আমরা যতটুকু সম্ভব প্রস্তুতি নিচ্ছি।
খাগড়াছড়ির ‘হোটেল অরণ্য বিলাস’র ম্যানেজার মো. সাগর বলেন, এবার ঈদ-বৈসাবি উৎসব ঘিরে আশানুরূপ পর্যটক হবে। ঈদের দিন থেকে আমাদের টানা বুকিং রয়েছে। ইতিমধ্যে মধ্যে আমাদের ৮০ শতাংশ বুকিং হয়ে গেছে।
খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মংসুইপ্রু চৌধুরী অপু বলেন, পাহাড়ে বাংলা নববর্ষ এবং বৈসাবি উদযাপন উপলক্ষে পার্বত্য জেলা পরিষদ, জেলা প্রশাসন, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ইনিস্টিটিউটের পক্ষ থেকেও নান কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
খাগড়াছড়ি পুলিশ সুপার মুক্তা ধর জানান, ঈদ, বৈসাবি উৎসব ও বাংলা নববর্ষ ঘিরে দেশী-বিদেশী পর্যটকে মুখর হয়ে উঠেছে খাগড়াছড়ি। তাই সকল সম্প্রদায়ের মানুষ যেনো নির্বিঘ্নে এই উৎসব উদযাপন করতে পারে সেই লক্ষ্যে জোরদার করা হয়েছে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
বাঙালিদের পহেলা বৈশাখ ও সাঁওতাল সম্প্রদায়ের পাতাবাহাসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র জাতি গোষ্ঠীরা ভিন্ন ভিন্ন নামে পালন করে এই উৎসব। সবমিলিয়ে খাগড়াছড়ি পরিণত হয় উৎসবের নগরীতে। উৎসবকে ঘিরে অন্যান্য বছরের মতো এবারও জেলাজুড়ে আয়োজন করা হয়েছে বর্ণিল অনুষ্ঠানমালার।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা এমপি বলেন, এবার ঈদ উল ফিতর, বৈসাবি ও বাংলা নববর্ষ উৎসব পাহাড়ের বসবাসরত মানুষের মাঝে সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন আরো সুদৃঢ় হবে।
তিনি বলেন, বংশ পরম্পরায় পালিত এই উৎসবের সাথে আধুনিকতার ছোঁয়ায় বৈসাবি হয়ে উঠেছে সর্বজনীন অন্য এক পাহাড়ি উৎসবে। উৎসবে সবার অংশগ্রহণে সাম্প্রাদায়িক সম্প্রীতি বৃদ্ধি পাবে।