পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের প্রনোদনা প্রকল্পে নানিয়ারচরে সূর্যমুখী চাষে সাফল্য, কৃষকের মুখে হাসি

224

নানিয়ারচর প্রতিনিধিঃ-রাঙ্গামাটি নানিয়ারচরে প্রথমবারের মতো সূর্যমুখী চাষ করে কাঙ্খিত ফলন পেয়ে খুশি চাষিরা। উপজেলার ৩টি ইউনিয়নের মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় সূর্যমুখী চাষ করেছেন ২৫ জন কৃষক। মাটি ও আবহাওয়া সূর্যমুখী চাষাবাদের জন্য উপযোগী। কম সময় ও অর্থ ব্যয় করে সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অপার।
নানিয়ারচর কৃষি বিভাগ সাধারণ কৃষকদের সূর্যমুখী চাষে উদ্বুদ্ধ করতে উদ্যমী কৃষকের হাত ধরে পরীক্ষামূলকভাবে নানিয়ারচর উপজেলা সদরে ২হেক্টর ৩টি ইউনিয়নের জমিতে ২ হেক্টর প্রথমবারের মতো উপজেলায় কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড সম্মিলিতভাবে প্রনোদনার মাধ্যমে সার ও বীজ প্রণোদনার মাধ্যমে চাষ হচ্ছে সূর্যমুখী ফুলের।
বর্তমানে সূর্যমুখী ফুলের সমারোহে মেতে উঠেছে উপজেলার মাঠগুলো। আবহাওয়া এখন পর্যন্ত অনুকূলে থাকায় কৃষকরা সূর্যমুখী ফুলের বাম্পার ফলনের আশা করছেন। তেল জাতীয় অন্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখীর চাষ অনেক সহজলভ্য ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় কৃষকেরা এতে উৎসাহিত হয়ে উঠবেন বলে উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে।
বুড়িঘাট ইউনিয়নের রামহরি গ্রামে ও ঘিলাছড়ি ইউনিয়েনে সূর্যমুখী চাষ করা জমিতে গিয়ে দেখা যায়, ফুটে থাকা হলুদ সূর্যমুখী ফুলের সমাহারে এক নয়নাভিরাম দৃশ্যের অবতারণা হয়েছে। চারদিকে হলুদ রঙের ফুলের মনমাতানো ঘ্রাণ আর মৌমাছিরা ছুটছেন এক ফুল থেকে অন্য ফুলে তাতে মুখরিত হয়ে উঠেছে কৃষকের জমি। এটি যেন ফসলি জমি নয়, এ এক দৃষ্টিনন্দন বাগান।
এমন মনোমুগ্ধকর দৃশ্য অবলোকনে শুধু প্রকৃতিপ্রেমীই নয় বরং যে কারো হৃদয় কাড়বে। তবে সূর্যমুখী ফুল চাষের লক্ষ্য নিছক বিনোদন নয়। মূলত ভোজ্যতেল উৎপাদনের মাধ্যমে খাদ্য চাহিদা মেটাতে এ চাষ করা হচ্ছে।
নানিয়ারচর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, সূর্যমুখীর চাষাবাদ কৃষকের কাছে জনপ্রিয় করে তুলতে ৩টি ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের ২৫ জন কৃষক ৪ হেক্টর জমিতে প্রণোদনার প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে কৃষকরা সূর্যমুখী ফুলের চাষ করা শুরু করেছেন, আগামীতে আরো কৃষক বাড়বে আশাবাদী। এতে সংশ্লিষ্ট উপজেলার কৃষক সুবিধাভোগী হিসেবে অংশ নিয়েছেন। ফুলের সৌন্দর্য দেখতে খামারে আসছেন দর্শনার্থীরা। অনেকে এটি চাষ করার পরামর্শও নিচ্ছেন। বর্তমানে একঘেয়েমি ধান চাষ করে কৃষকরা তেমন একটা লাভবান হচ্ছেন না। ধান চাষ করতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয় সেই টাকার ধান পাওয়া যায় না।
তাই অন্যান্য ফসলের চেয়ে সূর্যমুখী চাষে বেশি লাভের প্রত্যাশা অনেক বেশি। সূর্যমুখী ফুলের চাষ করলে ফুল থেকে তেল, খৈল ও জ্বালানি পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজ থেকে কমপক্ষে আধা লিটার তৈল উৎপাদন সম্ভব। প্রতি বিঘা জমিতে ৭ মণ থেকে ১০ মণ বীজ উৎপাদন হয়। তেল উৎপাদন হবে প্রতি বিঘায় ১৪০ লিটার থেকে ২০০ লিটার পর্যন্ত। প্রতি লিটার তেলের সর্বনিম্ন বাজার মূল্য ৩৫০ টাকা বা তার বেশি। প্রতি বিঘা জমিতে খরচ হয় সর্বোচ্চ ৪ হাজার টাকা। বর্তমানে বাজারে ভোজ্যতেলের আকাশছোঁয়া দাম হওয়ার কারণে চাহিদা বেড়েছে সরিষা ও সূর্যমুখী তেলের।
এছাড়া সূর্যমুখী ফুলের তেল অধিক পুষ্টিগুণ সম্পন্ন। তাই ডায়াবেটিস ও হৃদরোগীদের জন্য এই তেল অন্যান্য তেলের চেয়ে অনেক উপকারী ও স্বাস্থ্যসম্মত।
রামহরি পাড়া, ভূইয়াদম গ্রামের কৃষক ত্রিজীবন চাকমা জানান, নানিয়ারচর কৃষি অফিস ও পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের সহযোগিতায় আমি এই প্রথম অল্প জমিতে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করেছি। আমার সূর্যমুখী ফুলের জমি দেখার জন্য দূরদূরান্ত লোকজন ছুটে আসছে। বিকেল বেলায় অনেকে লোকজন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে দেখতে আসেন এ সূর্যমুখী ফুলের জমি, জমির পাশে ছবি তুলেন সময় কাটান অনেকেই। তা দেখে আমার খুবই আনন্দ লাগে! শুনছি এটি খুবই লাভজনক একটি ফসল।
ইতোমধ্যেই প্রতিটি গাছেই ফুল ধরেছে। আশা করি সূর্যমুখী চাষে সফলতা আসবে। লাভবান হতে পারব ইনশাআল্লাহ। কৃষি অফিসের সহযোগিতা নিয়ে ধানের পরিবর্তে আগামী বছর আরও জমি বাড়িয়ে সূর্যমুখী ফুলের চাষ করবো বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমাকে দেখে এলাকার অনেক কৃষকরা সূর্যমুখী ফুলের চাষে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।
নানিয়ারচর উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদুর রহমান বলেন, সূর্যমুখী এক দিকে মনোমুগ্ধকর ফুল অন্যদিকে লাভজনক ফসল। কৃষকদের বিস্তারিত জানিয়ে সূর্যমুখী আবাদ করার পরিকল্পনা করি। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহের দিকে সারিবদ্ধভাবে বীজ বপন করা হয়। বীজ বপনের ৯০-১০০ দিনের মধ্যে ফসল তোলা যায়। সামান্য পরিমাণ রাসায়নিক সার ও দুবার সেচ দিতে হয় এ ফসলে। প্রতি একর জমিতে ২০-২২ হাজার টাকা খরচ হয়। আর এক একর জমির উৎপাদিত বীজ থেকে ৬০-৬৫ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। সূর্যমুখী গাছ জ্বালানি হিসেবেও ব্যবহার করা যায়।
নানিয়ারচর উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ মো: আহসান হাবিব বলেন, এ উপজেলায় প্রথমবারের মতো সূর্যমুখীর চাষ হয়েছে। আগামীতে সূর্যমুখীর চাষ করবে কৃষকরা। সূর্যমুখীর বীজ থেকে যে তেল উৎপন্ন হয় তা স্বাস্থ্যসম্মত ও মানসম্পন্ন। অলিভ ওয়েলের পরেই সূর্যমুখী তেলের অবস্থান। সয়াবিন ও সরিষা ভোজ্য তেলের ঘাটতি পূরণ করবে সূর্যমুখী তেল। বেশি লাভজনক ফসল সূর্যমুখী।
তিনি বলেন, আশা করছি ভালো ফলন হবে। আগামীতে এই উপজেলায় এ প্রকল্প থাকলে সূর্যমুখী ফুলের চাষ ব্যাপক হারে আরও সম্প্রসারিত হবে। প্রথমবার কৃষকেরা সূর্যমুখী চাষ করে লাভবান হবেন বলে আমি আশাবাদী।
কৃষকদের এসব তেল প্রক্রিয়াজাত এবং বাজারজাত করার ক্ষেত্রেও কৃষি অফিসের পক্ষ থেকে কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করা হবে বলে।