বাড়িতে টিভি নেই, অন্যের মোবাইলে মেয়ে রুপনার খেলা দেখেছিলেন মা

13

নিহার বিন্দু চাকমা, রাঙ্গামাটিঃ-“বাড়িতে টিভি নেই, অন্যের মোবাইলে মেয়ের খেলা দেখেছিলেন মা। তাঁর মেয়ে ছোটবেলা থেকে বেশি মনোযোগী ছিলেন খেলাধুলায়। শৈশবকালেও শরীরে জ্বর নিয়ে খেলেছিল ফুটবল। মেয়ে হয়েও মেয়ে বন্ধুদের পছন্দ হতো না, পছন্দ হিসেবে বেছে নিতো খেলোয়ার ছেলে বন্ধু। জন্মের আগেই হারিয়েছেন বাবাকে, বড় হয়েছেন মায়ের কোলে। দুঃখ কষ্টে দিন কাটানো অভাবের সংসারে দুই ছেলে দুই মেয়েসহ ভাঙা ছোট্ট কুঁড়ে ঘরে মায়ের বসবাস। ভাই বোনের মধ্যে সবার ছোট রুপনা চাকমা। একদিন নানিয়ারচরে খেলতে গিয়ে ছিলেন ফুটবল। খেলা পছন্দ হয়ে বীরসেন চাকমা ও শান্তি মনি চাকমা তাকে ঘাগড়াতে নিয়ে যায়। মায়ের বুক খালি হলেও মা ভাই বোনদের ছেড়ে ঘাগড়াতে কেটে যায় শৈশব জীবন। সেখান থেকেই রুপনার জীবনের উন্নতির সূচনা ঘটে” নারী সাফ চ্যাম্পিয়ন দলের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক রুপনা চাকমার মা কালা সোনা চাকমা এসব বর্ণনা দিয়েছেন।
রুপনার গ্রামের বাড়িতে যেতে আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে যেতে হয়। তিনি হাজাছড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াকালীন একদিন বিদ্যালয় থেকে ২০১২ সালে নানিয়ারচর উপজেলা সদরে ফুটবল টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। রুপার খেলা দেখে মন কেড়ে নেয় শিক্ষক বীরসেন চাকমার। তৃতীয় শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় ঘাগড়া এলাকায় নিয়ে যান বীরসেন চাকমা ও শান্তি মনি চাকমা। অভাবের সংসারে মেয়ের ভরনপোষণ করা মায়ের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়ায় নিজের ঘরে আশ্রয় দিয়ে সন্তানের মতো বড় করে তোলেন বীরসেন ও শান্তি মনি। রুপনাকে ফুটবল খেলায় আগ্রহী দেখে মায়ের অনুমতি নিয়ে দায়িত্বভার নেন দুইজনেই। পাশাপাশি ঘাগড়া স্কুল মাঠে গোলরক্ষকের প্রশিক্ষণ দেন তাঁরা।
জাতীয় দলের অন্যতম সেরা পাঁচ নারী ফুটবলারের মধ্যে আনাই মগিনি, আনুচিং মগিনি, মনিকা চাকমা তাঁরা তিনজনেই পার্বত্য খাগড়াছড়ি জেলা থেকে। ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তাঁরা সকলেই এসএসসি পাস করেছেন। অন্যদের মধ্যে দুজন রিতু পূর্ণা চাকমা ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ে বিকেএসপিতে চলে যান। রিতুর বাড়ি কাউখালি উপজেলার ঘাগড়া ইউনিয়নের মগাছড়িতে। আর শৈশব থেকে শিক্ষক বীরসেন চাকমার মাধ্যমে ঘাগড়ায় চলে যান নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ির ভূঁইয়াদাম সন্তান ও শ্রেষ্ঠ গোল রক্ষক রুপনা চাকমা। অনেক দলকে হারিয়ে ফাইনালে নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এজন্যে তাঁদের গ্রামের মানুষ দেশের জন্য বড় অর্জন দেখে খুশিতে আত্মহারা। কেননা রুপনা চাকমা ভূঁইয়াদাম গ্রামের মেয়ে। তাঁর খেলা দেখে দেশের মানুষ আনন্দে উচ্ছ্বসিত। খেলা শেষ হওয়ার পর প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক বিভিন্ন গণমাধ্যমের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনন্দন জানিয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেন হাজার হাজার মানুষ। শুধু তাই নয়, তাকে দেখে এখন রুপনার মতো ফুটবল খেলায় আগ্রহ জানিয়েছেন একই গ্রামের রুপনার ছোট বেলার সহপাঠী এক মেয়ে রিপনা চাকমা।
মেয়ের খেলা নিয়ে মায়ের অনুভূতি জানতে চাইলে রুপনা চাকমার মা কালা সোনা চাকমা বলেন, ‘আমি খুবই খুশি হয়েছি। কেননা গরীব ঘরের মেয়ে, তাও বাবা হারা মেয়ে আমার। সে এখন দেশে বিদেশে গিয়ে খেলা খেলতেছে। গ্রামবাসীরা তাকে নিয়ে প্রশংসা করতেছে। আমার মেয়ে গ্রামের সুনাম ছড়িয়ে দিয়েছে। আমার মেয়ে আরো অনেক দূর এগিয়ে যাক সবার কাছ থেকে আশীর্বাদ কামনা করছি।
পার্বত্য জেলা রাঙ্গামাটির নানিয়ারচর উপজেলার ঘিলাছড়ি ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের ভূঁইয়াদাম এলাকার মেয়ে “নারী সাফ চ্যাম্পিয়ন” দলের শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক রুপনা চাকমা। জম্মের আগে তাঁর বাবা গাছা মনি চাকমা মৃত্যুবরণ করেন। বাবার দেখা না পেলেও নিজেকে গড়ে তুলতে কখনও আত্মবিশ্বাস হারায়নি সে। দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষক হওয়ায় তিনি এখন বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আর্ন্তজাতিক পর্যায়ে। তাঁর খেলা ও অর্জন দেখে গ্রামের মানুষও বেশ খুশি। তাঁর এই অর্জনে গর্বিত সারা বাংলাদেশের মানুষ। তবে পার্বত্য জেলার মেয়েদের এমন অর্জন দেখে তাঁদেরকে সংবর্ধনা এবং সহায়তা প্রদান না করায় ক্ষুব্ধ হন সাধারণ জনতা। এতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে স্ট্যাটাসের মাধ্যমে সমালোচনার ঝর উঠে।
এ প্রসঙ্গে রুপনার আপন বড় ভাই শান্তি জীবন চাকমা বলেন, ‘আমার ছোট বোন রুপনা শৈশব থেকে খেলা পছন্দ করতো। খেলার জন্য ছেলেদের সাথে বেশি মিশতো। আমি বিকেলে কাজ শেষে বাড়িতে ফিরে মায়ের কাছে শুনি বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। আমি অত্যন্ত খুশি ও গর্বিত যে আমার বোন এই অর্জন শুধু তার নয় দেশের জন্য সুনাম করেছে। এই সুনাম অর্জনের পিছনে তাঁর শিক্ষক বীরসেন চাকমা ও শান্তি মনি চাকমা অনেক অবদান রয়েছে।
রুপনার আগন বড় ভাই অতীল চাকমা বলেন, আমার বোন যে অনেকগুলো গোল রক্ষা করে বিজয় এনে দিয়েছে তা বলার মতো না। ভাই হিসেবে আমি অত্যন্ত গর্বিত। আমার বোন এতদূর আসার পেছনে মূল কারিগর হলেন ঘাগড়ার শিক্ষক শান্তি মনি চাকমা ও বীরসেন চাকমা। তাঁদের দুজনের ছাঁয়া হয়ে যদি না থাকত তাহলে রুপনা কখনও এ পর্যন্ত কখনও আসতে পারত না।’
ভূঁইয়াদামের বাসিন্দা আলো বিকাশ চাকমা বলেন, ‘রুপনা অসহায় এক মায়ের সন্তান। জীবনে বাবাকেও দেখেননি। সেই রুপনা আজ আমাদের গ্রামের সুনাম চারদিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। দেশ ও জাতির সম্মান এনে দিয়েছে। সে এখন দেশের গর্ব ও আগামী প্রজন্মের পথপ্রদর্শক।’
একই গ্রামের প্রধান সুদত্ত বিকাশ চাকমা বলেন, ‘রূপনা চাকমা সম্পর্কে আমার ভাগিনা হয়। সে ছোটবেলা থেকে খেলাধুলায় আগ্রহী ছিলেন। গ্রামের মানুষ তাঁকে নিয়ে গর্ববোধ করতেছে। তবে এ পর্যন্ত তাঁকল ও তাঁর পরিবারকে সাহায্য সহযোগিতা করতে কাউকে দেখিনি। সরকার চাইলে রুপনার জন্য অনেক কিছু করতে পারে।’
ফুটবলার কারিগর বীরসেন চাকমা বলেন, ‘২০১২ এবং ২০১৩ সালে রুপনাকে ঘাগড়াতে আনতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সে রাজি ছিল না। ২০১৪ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়া অবস্থায় তাঁকে ঘাগড়াতে নিয়ে আসি। বর্তমানে সে সেরা গোলরক্ষক হিসেবে কৃতিত্ব অর্জন করেছে। এ অর্জন শুধু তাঁর নয়, এই অর্জন সারা দেশবাসীর।’
ঘিলাছড়ি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) প্যানেল চেয়ারম্যান বাসন্তী চাকমা বলেন, ‘রুপনা আমার ইউনিয়নের মেয়ে। তাঁর জন্য আমি গর্ববোধ করি। সে আমাদের গ্রামের মেয়ে হয়ে দেশের জন্য শিরোপা এনে দিয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে তাকে যদি সহায়তা করা হয় তবে অনেক ভালো হয়। কেননা তার বাবা নেই। ছোটবেলা থেকে সে তার বাবাকে দেখেনি।’
এদিকে রূপনা চাকমা ও রিতুপর্ণা চাকমার প্রশংসা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে মঙ্গলবার (২০ সেপ্টেম্বর) বিকেলে রুপনা ও রিতুর বাড়িতে যান রাঙ্গামাটি জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। তাঁদের দু’জনের পরিবারের কাছে জনপ্রতি দেড় লাখ টাকা করে মোট তিন লাখ টাকার চেক প্রদান করেন। এতে বাংলাদেশ মানবাধিকার কমিশনের সাবেক সদস্য নিরূপা দেওয়ান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল ইসলাম, নানিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফজলুল রহমানসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
ঘোষণা ছাড়াই রুপনা ও রিতুর বাড়িতে ভালোবাসার উপহার নিয়ে হাজির হওয়ায় জেলা প্রশাসক মোঃ মিজানুর রহমানকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান রাঙ্গামাটিবাসী। এসময় জেলা প্রশাসক সাংবাদিকদের বলেন, ‘রিতু ও রুপনা আমাদের রাঙ্গামাটির গর্ব।তাঁদের এই অর্জন পুরো বাংলাদেশের মানুষ গর্বিত। তাঁদের এ কৃতিত্বের জন্য পুরস্কৃত করা হয়েছে। রিতু ও রুপনা দুই ফুটবলার পরিবারকে দেড় লাখ টাকা করে ৩ লাখ টাকা উপহার তুলে দেওয়া হয়েছে। এছাড়াও রুপনা গ্রামের এলাকাবাসীর সুবিধার্থে একটি ব্রীজ ও একটি বাড়ি নির্মাণের আশ্বাস দেন জেলা গ্রশাসক মোহাম্মদ মিজানুর রহমান। অন্যদিকে, রিতু পূর্ণার গ্রামবাসীদের সুবিধার্থে রাস্তা নির্মাণ ও চাকরির ক্ষেত্রে সহায়তা প্রদান করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন।’
তবে মনিকা, রুপনা, ঋতু, আনাই, আনুদের ফুটবল প্রশিক্ষক শান্তি মনি চাকমা সোমবার রাতে দুঃখ প্রকাশ করে তাঁর ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট করেন। পোস্টে তিনি উল্লেখ করেন- “আজ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হয়ে অনেক জনে অনেক লেখালেখি করছে দেখছি। তাদের লেখাগুলো পড়ে আর চুপ থাকতে পারলাম না। তাই আমি ও কিছু লিখতে বসলাম। কারণ না যেনে না বুঝে লেখালেখি করা ঠিক না। যারা এখন দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে বলছি আমি মনিকা, রুপনা, ঋতু, আনাই, আনু তাদের কথা। ওরা কোথায় থেকে এতদুর এগিয়ে গেল কেউ কি সে খবর নিয়েছেন? প্রথমে আমি বলবো শ্রদ্ধেয় দাদা বীরসেন চাকমার কথা। তার পর আসুন, শ্যামল দা, নলিনী কাকা, ধারশ দা, ধন দা এবং ঘাগড়া এলাকাবাসী। কিন্তু দুঃখের সাথে বলতে হচ্ছে তাদের কথা তো একবার ও লিখতে দেখলাম না? রুপনা চাকমার যাবতীয় দায়দায়িত্ব নিজে বহন করে ছিলেন নলিনী কাকা। তার বাড়িতে নিয়ে বছরকে বছর নিজের মেয়ের মত লালন পালন করেছিলেন। তার মত করে কম বেশি ধারশ দা, শ্যামল দা, ধন দা আরো অনেকে সহযোগিতা করেছিলেন সেই মনিকা, রুপনা, আনাই, আনু, ঋতুদের। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো তাদের কথা কেউ কোন দিন জানতে চায়নি এবং লেখলেখি ও করেনি। আমি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবো, মনিকা, রুপনা, আনাই, আনু, ঋতু এরা এতদুর এগিয়ে যাওয়া একমাত্র অবদান ছিল বীরসেন দা, শ্যামল দা, ধারশ দা, কৌশিক দা, ধন দা, সুইলামং দা, শশী দা। আমার কথা বাদ ও দিলাম, সবাই এখন হাল চারলে ও সেই ২০১১ সাল থেকে এখনও আমি কিন্তু হাল ছাড়িনি। প্রতিদিন চলছে অনুশীলন। প্রায় ৪০ জন ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্রীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। বর্তমানে গ্রীস্মকালীন জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ন ঘাগড়া উচ্চ বিদ্যালয়। মনিকা, আনাই, আনু, ঋত, সবাই এই স্কুলের ছাত্রী, আর রুপনা এখন ও এই স্কুলের দশম শ্রেনীর ছাত্রী। এই লেখাগুলো লিখে কারো মনে যদি আঘাত দিয়ে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিবেন। আর কারো কিছু জানতে চাইলে ঘাগড়া চলে আসেন এলাকার যে কেউ বলে দেবে পাঁচ ফুটবলারের ইতিহাস। ধন্যবাদ সবাইকে। বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন দলে সকল খেলোয়ার কর্মকর্তাকে শুভেচ্ছা অভিনন্দন।”
এতে শিক্ষক বীরসেন চাকমা ও শান্তি মনি চাকমাসহ পাহাড়ের ফুটবলার কারিগরদের সরকারিভাবে পুরস্কৃত করার জোর দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট সকলেই।