তথ্য প্রযুক্তির যুগে স্মার্টফোনে আসক্তি বিপদ ডেকে আনছে শিশুদের

221

ডেস্ক রিপোর্টঃ-বর্তমান যুগকে বলা হয় তথ্য প্রযুক্তির যুগ। এ যুগে নিত্যদিনের অন্যতম সঙ্গী এখন স্মার্টফোন। কিন্তু বর্তমানে সেই স্মার্টফোন এখন বেশিরভাগ সময় থাকে শিশুদের দখলে। তথ্য প্রযুক্তির এই যুগে শিশুরা জন্মের পর থেকেই প্রযুক্তির সঙ্গে পরিচিত হচ্ছে। প্রযুক্তির এই ছোঁয়ায় শিশুদের স্মার্টফোনের আসক্তি বর্তমানে একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। শহুরে কিংবা গ্রামের শিশুরা এখন স্মার্টফোন নিয়ে বেশির ভাগ সময় কাটায়। এর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবও মারাত্মক। মহামারির এই সময়ে স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিশুরা বাসায় অবস্থান করছে। মানতে হচ্ছে সামাজিক দূরত্ব, তাই বাইরে বেরিয়ে শিশুর খেলাধুলোরও সুযোগ নেই বললেই চলে। ফলে বদ্ধ ঘরেই স্মার্টফোনের সঙ্গে সময় কাটছে বেশির ভাগ শিশুর শৈশব। তাই স্মার্টফোনের দিকে আরও বেশি আসক্ত হচ্ছে শিশুরা।
বিশ্বে ইন্টারনেট ব্যবহারকারী প্রতি ৩ জনে ১ জন শিশু। প্রতিদিন সংখ্যাটা প্রায় ১ লাখ ৭৫ হাজার, যার অর্থ প্রতি হাফ সেকেন্ডে একজন শিশু ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। শুধু তাই নয়, সমীক্ষা বলছে ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে ২৫ শতাংশেরই বয়স ১০-এর নিচে। স্মার্টফোনে অতিরিক্ত আসক্তি বিপদ ডেকে আনছে শিশুদের। প্রায়ই দেখা যায়, অভিভাবকরা বাচ্চাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব ধরিয়ে দেন। গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও চালিয়ে দিয়ে তাকে শান্ত রাখা হয়। আপনার-আমার সবার বাসাতেই এই চিত্র এখন নিত্যদিনের। স্মার্টফোনের কল্যাণে শিশুদেরকে শান্ত রাখা, খাওয়ানো, এমনকি বর্ণমালা ও ছড়া শেখানোর কাজটিও বাবা-মায়ের জন্য অনেক সহজ ও স্বস্তিদায়ক হয়ে উঠেছে। বিপরীতে স্মার্টফোনের উপর নির্ভরতা বাড়ছে শিশুদের। আর এই নির্ভরশীলতাই আমাদের অজান্তে শিশুদের জন্য ভয়াবহ বিপদ ডেকে আনছে। স্মার্টফোনের মোবাইল গেমসে শিশুরা দিন দিন বেশি আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক মা-বাবা ফোন নিয়ে বসে থাকেন অবসর সময় কাটানোর জন্য, অনুকরণ প্রিয় শিশুরাও মা-বাবাকে অনুসরণ করতে চায়। আমাদের প্রায় সব ছেলে-মেয়ের অবস্থা একই রকম। ছোট ছোট বাচ্চার হাতে যেভাবে মোবাইল তুলে দেওয়া হচ্ছে, তা ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে সে বিষয়ে কিছুটা হলেও আন্দাজ করা যাচ্ছে।
শিশুদের মোবাইল ফোনে এত বেশি আকৃষ্ট হওয়ার কারণ কী? প্রথমত, শহরের অধিকাংশ পরিবারে মা-বাবা দু’জনই চাকরিজীবী। অফিস শেষ করে সন্তানদের পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। ফলে শিশুরা মা-বাবার আদর যত্ন থেকে অনেকাংশে বঞ্চিত হন। তাই তারা বাচ্চাদের অবসর সময় কাটানোর জন্য ফোন, ট্যাব কিংবা ল্যাপটপ দিচ্ছেন। ফলে শিশুরা সহজেই এসবে আসক্ত হচ্ছে। দ্বিতীয়ত, একসময় শিশুদের খেলাধুলা করার জন্য পর্যাপ্ত মাঠ ছিল। তখন বাচ্চারা বাইরে খোলা মাঠে খেলাধুলা করত। বর্তমানে ঘরের বাইরে শিশুদের খেলতে পাঠানোর আগে নিরাপত্তার বিষয়টিও ভাবেন অভিভাবকরা। তাই অনেক অভিভাবকই ঘরে বাচ্চাদের গেমস, কার্টুন দেখে সময় কাটানোকে শ্রেয় মনে করেন। তৃতীয়ত, আপনি হয়তো কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজে ব্যস্ত। আপনার পাশে বসে ছোট বাচ্চাটা দুষ্টুমি করছে। তাকে শান্ত রাখার জন্য তার হাতে স্মার্টফোন বা ট্যাব ধরিয়ে দিলেন। গান, কার্টুন বা মজার ভিডিও ছেড়ে দিয়ে তাকে নিমিষেই শান্ত করে আপনি আপনার কাজে মনোনিবেশ করলেন। এভাবেই শিশুরা আসক্ত হচ্ছে। এর ফলে শিশুদের পারিবারিক ও মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে।
কিশোর-কিশোরীরা স্মার্টফোনের ক্ষেত্রে এক ধরণের আকর্ষণ বোধ করে যে, মোবাইল ফোনে মেসেজ এলে এর দ্রুত জবাব দেওয়া। এতে করে আসক্তি ক্রমশ আরও বাড়তে থাকে। শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর অতিরিক্ত স্মার্টফোন ব্যবহার যে প্রভাব ফেলছে, তা সত্যিই বিবেচনা করার মতো বিষয়। অনেক পরিবারেই দেখা যায় যে বড়দের তুলনায় বাচ্চারাই বামা-মায়ের স্মার্টফোন বা ট্যাবলেট ব্যবহার করছে এমনকি এতে তারা অভিভাবকদের চেয়ে বেশি পারদর্শিতাও অর্জন করে ফেলেছে। অনেক শিশুর ক্ষেত্রে এটা রীতিমত আসক্তিতে পরিণত হয়েছে। শিশুরা বাবা-মায়ের ফোন নিেয়ে এত বেশি সময় কাটাচ্ছে যে অনেক অভিভাবকই এতে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন।
স্মার্টফোন আসক্তি শিশুর ধৈর্য ও মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে শিশু ধীরে ধীরে অসহিষ্ণু, অসামাজিক ও উচ্ছৃঙ্খল হয়ে পড়ে। তার সহজাত সামাজিক গুণাবলির বিকাশ বাধাপ্রাপ্ত হয়। অনেক সময় ধরে ফোন ব্যবহারের কারণে শিশুরা পর্যাপ্ত ঘুম থেকে বঞ্চিত হয়। এতে তারা ‘মনোযোগের ঘাটতিজনিত চঞ্চলতা’ বা ‘অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপার আ্যক্টিভিটি ডিসঅর্ডার’ নামক জটিলতায় ভোগে। স্মার্টফোনের মাধ্যমে শিশুরা অপ্রাপ্ত বয়সেই না বুঝে বিভিন্ন অনৈতিক ও আপত্তিকর বিষয়বস্তুর সম্মুখীন হয়। সহজেই এ বিষয়গুলোর মুখোমুখি হওয়ায় তারা এগুলোকে স্বাভাবিক ভাবে গ্রহণ করছে। বড়দের উদাসীনতা বা অবহেলায় বাচ্চারা মোবাইল ফোনে আসক্ত হয়ে পড়ছে; যার প্রভাব ও কুফল খুবই ভয়ংকর।
স্মার্টফোন থেকে নির্গত রেডিয়েশন মস্তিষ্ক, কানসহ নানা অঙ্গের ক্ষতি করে। একটি বাচ্চার স্বাভাবিক ভাবে বেড়ে ওঠার সময়ে তা আরও ক্ষতিকর। মস্তিষ্ক ও কানে নন-ম্যালিগন্যান্ট টিউমার হওয়ার ভয়ও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। যত বেশি সময় শিশু টিভি, স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের সঙ্গে কাটাবে, ততই তার মানসিক, শারীরিক বিকাশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
আসক্তি কমাতে অভিভাবকদের প্রথম কাজ হচ্ছে মোবাইল ফোন থেকে শিশুদের দূরে রাখুন। কারণ খুব বেশি মোবাইল ফোন ব্যবহারের ফলে শিশুদের মধ্যে আচরণগত সমস্যা দেখা দেয়৷ আপনার শিশুকে আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি থেকে দূরে রাখতে চাইলে ওর হাতে স্মার্টফোন দেবেন না। যে শিশু নিয়মিত মোবাইল ব্যবহার করে, তাকে কয়েকদিন মোবাইল থেকে দূরে রাখুন। তার আচরণের পরিবর্তনটুকু নিজেরাই বুঝতে পারবেন। তবে প্রথম দিকে একটু অসুবিধা হবে, যা একেবারেই স্বাভাবিক।
মোবাইল ফোন সংক্রান্ত ঝুঁকি হ্রাস করার জন্য পারিবারিকভাবে অভিভাবকদের উদ্যোগ নিতে হবে। শিশুদের বড় হওয়ার সময় মোবাইল ফোন থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সঠিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ১৬ বছরের কম বয়সের শিশুদের সেল ফোন দেওয়া থেকে বিরত থাকুন। আপনার শিশু যখন ফোনে কথা বলে তখন ফোনটি কানের কাছে ধরার পরিবর্তে তার যুক্ত হেডসেট ব্যবহার করুন। ভ্রমণের সময়, আপনার শিশুকে ক্রমাগত আপনার মোবাইল ফোন দেওয়া এড়ানো উচিত। প্রাপ্তবয়স্ক হিসাবে, বাবা–মা এবং বাড়ির অন্যান্য লোকেরা যখন শিশুদের আশেপাশে থাকেন তখন তাদের ফোন ব্যবহার সীমাবদ্ধ করা গুরুত্বপূর্ণ। এটি কেবল রেডিয়েশন এড়ানোর উদ্দেশ্যে নয়, পাশাপাশি শিশুদের আচরণের ধরণ তৈরি করতেও গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের স্কুলে ফোন নেওয়া থেকে পুরোপুরি সীমাবদ্ধ করুন। আপনার মোবাইল ফোনগুলো আপনার সাথে নিরাপদে রাখুন এবং রাতে আপনার শিশুদের নাগালের বাইরে রাখুন। শিশুরা আপনার অবর্তমানে চুপচাপ এটিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করতে পারে। স্মার্টফোনের প্রযুক্তিগত দক্ষতা অসাধারণ এবং এটি শিশুদের শেখার জন্যও বেশ ভালো সরঞ্জাম। তবে জিনিসগুলোকে সংযত রাখা এবং ব্যবহারের সময়কে সীমাবদ্ধ করে শিশুদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করা এবং তাদের মধ্যে ভালো আচরণগত অভ্যাস গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অনেক বেশি এগিয়ে যায়। (সংগৃহিত)